শুক্রবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১২

বাঙালী মুসলমানের মন - ১ : আহমদ ছফা

বাঙালী মুসলমানের মন - ১ : আহমদ ছফা



'শহীদে কারবালা' পুঁথিতে কবি কারবালার যুদ্ধে শহীদ হজরতের দৌহিত্র হজরত হোসেনের মস্তকসহ ঘাতক সীমারের দামেস্‌ক যাত্রা অংশটি রচনা করতে যেয়ে তাঁর কল্পনাশক্তির অবাধ ব্যবহার করেছেন। কবি বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন : কারবালা থেকে দামেস্‌ক যাচ্ছে সীমার, মনে অপার আনন্দ, এখন হজরত হোসেন বিগতজীবন, কাঁধের বর্শার অগ্রভাগে শোভা পাচ্ছে  তাঁর কর্তিত মস্তক। লক্ষ টাকা পারিতোষিক লাভ করার পথের যাবতীয় প্রতিবন্ধক অন্তর্হিত। নিশ্চয়ই বাদশাহ্‌ নামদার এজিদ তাঁর প্রতিশ্রুতি পালন করবেন। যেতে যেতে সন্ধ্যা হলো পথে। সে রাতের জন্য সীমারকে এক গৃহস্তের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হলো। গৃহকর্তার নাম পুঁথিলেখকের জবানীতে আজর। হিন্দু ধর্মালম্বী, তার ওপর আবার ব্রাহ্মণ। সেই রাতে হজরত হোসেনের ছিন্ন মস্তক এক আলৌকিক কাজ করে ফেলল। গৃহকর্তা আজর, তাঁর ব্রাহ্মণী, সাতপুত্র এবং সাত পুত্রবধূ এক সঙ্গে কাটা মস্তকের মুখে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেল।

পুঁথি-পুরাণের জগতে এরকম আলৌকিক কান্ড প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। ওই জাতীয় সাহিত্যের বেশির ভাগেরই একটি মুখ্য বৈশিষ্ট্য হলো ধর্মের মহিমা কীর্তন করা। সেজন্য পুঁথি-পুরাণের নায়কদের চরিত্রে সম্ভব-অসম্ভব সব রকমের ক্ষমতা এবং গুণগ্রাম আরোপ করাটাই বিধি। এদিক দিয়ে দেখতে গেলে আধুনিক প্রোপাগান্ডা লিটারেচারের সঙ্গে পুঁথিসাহিত্যের একটা সমধর্মিতা আবিষ্কার করা খুব দুরূহ কর্ম নয়। শুধু পুঁথিসাহিত্যে কেন, 'বৌদ্ধ জাতক' থেকে শুরু করে, 'শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত' এবং 'মঙ্গলকাব্য' সমূহেরও উদ্দেশ্য ছিল ঐ একই রকম। ঐ জাতীয় সাহিত্যে সচরাচর যে অবাস্তব-আলৌকিক কান্ড ঘটে থাকে, ঘেঁটে একটা তালিকা সংগ্রহ করলে ছিন্ন মস্তকের মুখে কালেমা পড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করাটা খুব আশ্চর্য ঠেকবে না। পুঁথি-পুরাণের রচয়িতাদের পাল্লায় পড়ে বনের হিংস্র বাঘ, শিংঅলা হরিণ পর্যন্ত মানুষের ভাষায় কথা বলে, কাটা মাথা তো কোন্‌ ছার! সুতরাং ধরে নেয়া ভালো পুঁথি-পুরাণের জগতে জাগতিক নিয়মের পরোয়া না করে লোমহর্ষক ঘটনারাজি একের পর এক অবলীলায় ঘটে যেতে থাকবে। রোমাঞ্চকর হিন্দি ছবির দর্শকের মতো পাঠকের রুদ্ধশ্বাসে দেখে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না; সম্ভব-অসম্ভব, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন তোলা অর্থহীন। যেমন : 'লাখে লাখে সৈন্য চলে কাতারে কাতার/গণিয়া দেখিল মর্দ চল্লিশ হাজার।'  এ জাতীয় পংক্তি পাঠ করার পরেও বুদ্ধিমান সিরিয়াস মানুষের মনে কোনো জিজ্ঞাসা-চিহ্ন জাগে না। অর্থাৎ সকলেই ধরে নিয়ে থাকেন, পুঁথি-পুরাণের জগতে এ জাতীয় ঘটনা হামেশা ঘটতেই থাকবে। এ নিয়ে মনকে কষ্ট দেয়া খামোখা পন্ডশ্রম। কান্ডজ্ঞানকে ফাঁকি দেয় এ জাতীয় এন্তার ঘটনা সম্বন্ধে ওয়াকেবহাল হতে হবে, সে ব্যাপারে আগাগোড়া প্রস্তুতি গ্রহণ করেই পুঁথি-পুরাণের জগতে প্রবেশ করা উত্তম।

এরকম অভিজ্ঞতা বোধ করি অনেকেরই হয়ে থাকে। রাশি রাশি ঘটনার মধ্যে একটি বিশেষ ঘটনার অতি সামান্য খন্ডাংশ মুহূর্তেই ধাক্কা দিয়ে পাঠককে সচকিত করে তোলে। 'শহীদে কারবালার' বর্ণিত এই ঘটনাটিও সেই জাতীয় একটি। সীমার কারবালা থেকে দামেস্‌ক যাওয়ার পথে আজর নামধারী জনৈক ব্রাহ্মণের দেখা পেয়েছিল এবং তার বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করছিল। এই অংশটি পাঠ করার পর মনের ভেতরে একটি ঘোরতর অবিশ্বাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এই সাধারণ একান্ত বাস্তব ঘটনাটিকে পাঠকের মনের জারক রস হজম করতে পারে না। মনের তলাতে শিলাখন্ডের মতো পড়ে থাকে। তিনি যদি তার বদলে ইরাকী, তুরানী, ইহুদী, খ্রিষ্টান, তাতার, তুর্কী ইত্যাদি যে-কোন জাতির যে-কোন ধর্মের মানুষের সঙ্গে সীমারের সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দিতেন, তাহলে পাঠকের মনে কোন প্রশ্নই জাগত না। তিনি কারবালা থেকে দামেস্‌কে যাওয়ার পথে ধু-ধু মরুপ্রান্তরে বাঙলা দেশের ব্রাহ্মণকে আমদানী করলেন কোত্থেকে? একজন ব্রাহ্মণ কারবালা দামেস্‌কের মাঝপথে দারা-পুত্র-পরিবার নিয়ে কাটা মস্তকের কাছে কালেমা পড়ে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য বসবাস করছিল, এইখানে মন ভয়ঙ্কর রকম বেঁকে বসে। শুধু 'শহীদে কারবালা' নয়, 'জঙ্গনামা' পুথিটার ওপর দৃষ্টি বুলোলেও এই রকম অজস্র ঘটনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। 'জঙ্গনামা'তে পুঁথিলেখক হযরত আলীকে দিয়ে কাফের ও বেদীনদের ওপর এমন চোটপাট চালিয়েছেন যে গদার আঘাতে থেতলানো, তলোয়ারের ঘায়ে কাটা পড়া কিংবা শেষ পর্যন্ত পবিত্র ইসলামের শরণ গ্রহণ না করা পর্যন্ত কারো রক্ষা নেই। আমীর হামজার শৌর্যবীর্য অবলম্বন করে যে পুঁথি রচিত হয়েছে তা পড়লে লোম দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো অনেক চমকপ্রদ সংবাদ পাওয়া যায়। প্রায়শ দেখানো হয়েছে, মহাবীর হামজা এমন শক্তিশালী যে তিনি দেশ-দেশান্তর ঘুরে ঘুরে কাফেরদের সদলবলে পরাস্ত করছেন আর তাঁদের ঘরের সুন্দরী নারীদের পাণিপীড়ন করে চলেছেন তো চলেছেনই। কাফের এবং হিন্দু পুঁথিলেখকের কাছে অনেকটা সমার্থক। অনেক সময় কাফের বলতে হিন্দু এবং হিন্দু বলতে কাফের ধরে নিয়েছেন। সে যা হোক, আমীর হামজা এমন মস্ত বড় বীর যে তিনি দৈত্যের দেশ কো-কাফে গমন করে অপার শৌর্য বলে দৈত্যদের দমন করে বীর বিক্রমে ফিরে এসেছেন। হযরত আলীর কল্পিত পুত্র মুহম্মদ হানিফার বীরত্বগাঁথা বর্ণনা করে সোনাভান, জৈগুনবিবি ইত্যাদি যেসব পুঁথি লেখা হয়েছে বিষয়-বৈচিত্রের দিক দিয়ে সেগুলো আরও মজার। সে সকল পুঁথিতে দেখা যায় যে, মুহম্মদ হানিফা 'দুলদুল' ঘোড়ায় দুইধারী তলোয়ার ঘুরিয়ে দেশ থেকে দেশে নব অশ্বমেধযজ্ঞ করে বেড়াচ্ছেন। পথে যেসব রাজ্য পড়ছে সবগুলো নারীশাসিত। এই নারীদের সকলেই সুন্দরী; সৎ ব্রাহ্মণ-কন্যা। অবিবাহিতা এবং প্রচন্ড রকমের বীরঙ্গনা। আর সকলের এমন এক ধনুকভাঙা পণ যে, বাহুবলে যে পুরুষ হারাতে পারবে তাকে ছাড়া অন্য কারো কাছে বিয়ে বসতে মোটেই রাজী নন। মুহম্মদ হানিফা সংবাদ শুনে হাওয়ার বেগে সে দেশে দেখা দিচ্ছেন, রণংদেহি হুংকার তুলছেন। বীরঙ্গনা ব্রাহ্মণ-কন্যাদের বাহুবলে পরাস্ত করে ইসলাম ধর্ম কবুল করিয়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করছেন। ব্যাপারটি এতই পৌনঃপুনিকভাবে ঘটেছে যে মুহম্মদ হানিফাকে মনে হবে ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন কুলীন হিন্দু-সন্তান, বিয়ে করে বেড়ানোই তাঁর একমাত্র পেশা। মুহম্মদ হানিফা মস্ত বীর হলে কি হবে, অধিক সংখ্যক রূপসী স্ত্রীর সঙ্গে রতি-রণ এবং ময়দান-রণ দুই-ই একসঙ্গে করতে হলে মাঝে মাঝে এই সমস্ত ভয়ংকর বীরাঙ্গনাদের হাতেও নাকাল হতে হয়। সেকালে বীরাঙ্গনাদের পরাজিত করতে পারলে স্বামী আর পরাজিত হলে থাকতে হত দাস হয়ে। সুতরাং হানিফারও দুর্দশার অন্ত থাকে না। সংবাদ যায় হযরত আলীর কাছে। বীর পুত্রের এসব কীর্তিকলাপ তিনি বিলক্ষণ সমর্থন করেন; আর হৃদয়ে অপত্যস্নেহও প্রচুর। হায়দারী হাঁক হেঁকে রণ-দামাম বাজিয়ে পুত্রের সাহায্যার্থে ছুটে আসেন। পুত্রকে শিখিয়ে পড়িয়ে একেবারে লায়েক করে সে সমস্ত বিক্রমশালীদের হার মানতে বাধ্য করান। তারপর যুদ্ধকার্য সাঙ্গ হলে পিতা-পুত্র একই সঙ্গে দুটো বিবাহ করেন। পিতা যান দেশে ফিরে আর পুত্রবর প্রেমতৃষ্ণায় মাতাল হয়ে মরুভূমির ডনজুয়ানের মত নতুন নারী-রত্নের সন্ধানে দেশে দেশে সফর করেন।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের বীর এবং সাধু পুরুষদের নিয়ে যে সমস্ত পুঁথিপত্র লেখা হয়েছে তাতে তাঁদের ত্যাগ, ধর্মনিষ্ঠা ইত্যাদির সঙ্গে সঙ্গে এ জাতীয় বিস্তর আদি রসাত্মক ব্যাপার-স্যাপার স্থান লাভ করেছে। যে সকল ঐতিহাসিক চরিত্র পুঁথিলেখকরা তাঁদের বিষয়ের উপজীব্য করেছেন, তাতে করে চরিত্রের ঐতিহাসিক সত্য সম্পুর্নভাবে খেলাপ করে নিজেদের মনে রাঙিয়ে একেবারে জুবুথুবু করে হাজির করেছেন। কল্পিত চরিত্র হলে তো কথাই নেই, আগাগোড়া রঙ চড়িয়ে রঙিলা না করে ছাড়েননি। তা করতে যেয়ে পুঁথিলেখকেরা পরিবেশ, সমাজ এবং সামাজিক সংঘাত, মূল্যচেতনা দুই হাতেই দেদার ব্যবহার করেছেন।

যেমন ধরা যাক, কারবালা থেকে দামেস্‌কে যাওয়ার পথে কোনো ব্রাহ্মণের বসবাসের বিষয়টি। তা তো একেবারে জানা কথাই যে ব্রাহ্মণের সেখানে নিবাস থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু তাহলে কি হবে, পুঁথিলেখকের সেটি জানা থাকা চাই তো। কারবালা-দামেস্‌কের মাঝপথে নয়, গোটা আরবদেশে ব্রাহ্মণ না থাকুক তাতে পুঁথিলেখকের কি আসে যায়! এই বাংলাদেশে তো ব্রাহ্মণ আছে! আর আমাদের পুঁথিলেখক ভদ্রলোকটি তো বাঙালী এবং তিনি ব্রাহ্মণ জাতটার ওপর হাড়ে হাড়ে চটা। সুতরাং অনায়াসে ব্রাহ্মণকে কারবালা-দামেস্‌কের মাঝপথে বসিয়ে স্ত্রী-পুত্রসহ সপরিবারে তাঁকে দিয়ে কালেমা পড়িয়ে মানসিক ঘৃণার প্রতিশোধ নেয়া যায় এবং নিয়েছেনও।

ইতিহাসে হজরত আলীকে কম বিচক্ষণ বলার যথেষ্ট অবকাশ আছে। কিন্তু তিনি মানুষ হিসেবে উদার মনের অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর চরিত্র এমন নির্মল সুন্দর ছিল যে এখনো পর্যন্ত তাঁর গুণগ্রাম সর্বসাধারণের অনুকরণীয় বলে বিবেচনা করা হয়। পুঁথিলেখক তাঁকে শক্তিমন্ত এবং বীর দেখাতে যেয়ে পশুশক্তিতে বলীয়ান হৃদকম্প সৃষ্টিকারী একজন প্রায় নারীলোলুপ মানুষের চিত্র অঙ্কন করেছেন।

হজরত হামজা মদীনাতে ওহোদের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন এবং হিন্দা নাম্নী জনৈক কোরেশ রমণী যে তাঁর রক্তাক্ত হৃদপিন্ড চিবিয়ে খেয়েছিল একথা সর্বজনবিদিত। তিনি জীবনে মক্কা-মদীনার বাইরে কোথাও গিয়েছিলেন কিনা সন্দেহ। পুঁথিলেখক তাঁকে শতাধিক বছর পরমায়ু দান করেছেন, কমপক্ষে অর্ধশত পত্নীর স্বামী, সে অনুপাতে পুত্র-পৌত্রাদি উপহার দিয়েছেন। আমির হামজা হাজার খানেক যুদ্ধে বিজয়ী বীর, দেশ-দেশান্তরে তাঁর অবারিত গতায়ত, এমনকি দৈত্যের দেশ কো-কাফে যেয়েও অসমসাহসিক কাজ সমাধা করে এসেছেন। এতেও পুঁথিলেখক তৎকালীন সমাজের প্রচলিত সংস্কার এবং শিল্পরুচির ব্যবহার করেছেন। হিন্দু সমাজের বীরেরা যদি পাতাল বিজয় করে বহাল তবিয়তে ফিরে আসতে পারেন, আমির হামজা দৈত্যের দেশে গমন করে তাদের শায়েস্তা করে আসতে পারবেন না কেন? ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে মুহম্মদ হানিফার মূল কান্ড কিছু নেই বলেই তো সুবিধা। কল্পনা যেভাবে ইচ্ছা বিচরণ করতে পেরেছে। হিন্দুদের দেবতা শ্রীকৃষ্ণ যদি বৃন্দাবনে ষোল শত গোপবালা নিয়ে লীলা করতে পারেন, মুহম্মদ হানিফার কি এতোই দুর্বল হওয়া উচিত যে মাত্র কয়টা ব্রাহ্মণ কন্যাকে সামলাতে পারবেন না!


এই ধরনের দো-ভাষী পুঁথিসমূহের বিষয়বস্তুর প্রতি কতিপয় বৈশিষ্ট্য পাঠকের চোখে পড়বেই। সেগুলোর মধ্যে অত্যন্ত প্রনিধানযোগ্য কয়েকটি হলো : প্রথমত ধর্মের মাহাত্ম্য বর্ণনা করার জন্যই এই সকল কাহিনী লেখকেরা বিবৃত করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন। নায়কের অসাধারন শৌর্যবীর্য এবং অসমসাহসী ক্রিয়াকলাপের অন্তরালে সত্যধর্মের বিজয়ই স্ফুরিত হচ্ছে, এটা স্বদেশবাসীর কাছে স্বদেশী ভাষায় প্রকাশ করাই বেশিরভাগ লেখকের মনোগত অভিপ্রায়। মহাভারতের বাংলা অনুবাদক যেমন বলেছেন : ‘মহাভারতের কথা অমৃত সমান/কাশীরাম-দাস কহে শুনে পুণ্যবান।’ তার অনুকরণ করে পুঁথিলেখকও পাঠক এবং শ্রোতাদের কাছে লোভনীয় আবেদন রেখেছেন। একটা দৃষ্টান্ত : ‘অধীন ফকির কহে কেতাবের বাত/যেবা শুনে বাড়ে তার বারেক হায়াত।’ এ জাতীয় হৃদয়-মনে উচ্চাকাঙ্খা সৃষ্টিকারী আশাব্যঞ্জক পংক্তিমালা পুঁথিগুলোর পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে রয়েছে। সুতরাং বিশ্বাস করতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে মানুষের মনে ধর্মবোধ জাগ্রত করা এবং ইসলাম ধর্মাশ্রিত মানুষের হাতে যে সাংসারিক সম্পদ, সুন্দরী নারী আপনআপনি এসে পড়ে এবং পরকালে অনন্ত সুখভোগের লীলাস্থল বেহেশত তাঁদের জন্য অবধারিত, আর শত্রুদের ওপর তাঁদের বিজয় অর্জন সে তো এক রকম স্বাভাবিকই – এ সকল বিষয় প্রমাণ করাই ছিল পুঁথিলেখকদের অধিকাংশের মনের অভিপ্রায়। দ্বিতীয়ত, এই পুঁথিসমুহের প্রতি তীক্ষ্ন বিশ্লেষনাত্মক দৃষ্টি ফেললে একটা জিনিশ বারবার চোখে পড়তে থাকে। যে সময়ে এগুলো রচিত হয়েছিল, সে সময়কার মুখ্য-গৌণ বিবদমান, বর্ধিষ্ণু-ক্ষয়িষ্ণু যে সকল সামাজিক ধারা, ধারাসমুহের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্ব-সংঘাত কোথাও প্রচ্ছন্নভাবে, আবার কোথাও সুস্পষ্টভাবে পুঁথিসাহিত্যের ছাপ ফেলেছে। পুরনো সমাজের গর্ভ থেকে তুর্কী আক্রমণের ফলে আরেকটি নতুন সমাজ জন্মলাভ করেছে এবং সমাজের জনগণের একাংশের মধ্যে নতুন চলমানতা অর্জনকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নতুন আকাঙ্ক্ষার পরিতৃপ্তি বিকাশ করার উদ্দেশ্যেই পুঁথিলেখকেরা রচনায় মনোনিবেশ করেছেন। তার ফলে তাদের মনেও নতুন এক ধরণের জনপ্রিয় বীরশ্রেণী জন্মলাভ করতে আরম্ভ করে। পুরনো সমাজের যে সকল নায়ক, খলনায়ক – রামচন্দ্র, লক্ষণ, সীতা, রাবণ, ভীম, অর্জুন, হনুমান, কর্ণ, ভীস্ম, দ্রোণ, শ্রীকৃষ্ণ, রাধিকা, দ্রৌপদী ইত্যাদির কাহিনীতে ধর্মীয় এবং সামাজিক কারণে মুসলমান সমাজ মনোনিবেশ করতে রাজী ছিল না। এই নতুন সমাজের নিজস্ব নায়ক চাই, চাই নিজস্ব বীর। যাঁদের জীবনকথা আলোচনা করে দুখেঃ সান্ত্বনা, বিপদে ভরসা পাওয়া যায়, যাঁরা তাদের আপনজন হবেন এবং একটি আদর্শায়িত উন্নত জীবনের বোধ সৃষ্টি করতে পারবেন। এই সকল কারণের দরুণ হযরত মুহম্মদ, হযরত আলী, বিবি ফাতেমা, হাসান-হোসেন, বীর হানিফা, আমির হামজা, হাতেমতাই, রুস্তম ইত্যাদি চরিত্র বাংলা সাহিত্যে নবজন্ম লাভ করে। তাঁদের জন্ম-প্রক্রিয়ার মধ্যে দুটি মুখ্য বিষয় মিলমিশ খেয়েছে। এই ঐতিহাসিক মহামানবদের যে সকল কীর্তি-কাহিনী লোকশ্রুতি-জনশ্রুতির আকারে তাঁদের কাছে এসে পৌঁছেছে (পুঁথিলেখকদের অধিকাংশই আরবী ফার্সী জানতেন না এবং ইসলামী শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন না) তার সঙ্গে মহামানব এবং সামাজিক নায়কদের সম্পর্কে প্রচলিত যে ধারণা তৎকালীন সমাজে বলবৎ ছিল তার সংশ্লেষ ঘটেছে। তাই ইসলামের দিকপালদের নিয়ে রচিত পুঁথিসাহিত্যে যেমন চরিত্রের ঐতিহাসিকতা পাওয়া যাবে না, তেমনি বাঙালী সমাজের প্রচলিত বীরদের সম্বন্ধে যে ছকবাঁধা ধারণা বর্তমান ছিল তাও পুরোপুরি উঠে আসেনি। দুটি মিলে একটি তৃতীয় বস্তুর সৃষ্টি হয়েছে। আসলে পুঁথি সাহিত্য হলো দুটি পাশাপাশি সমাজব্যবস্থা এবং সামাজিক আদর্শের ঘাত-প্রতিঘাতে মুসলমান জনগণ যেভাবে সাড়া দিয়েছে তারই প্রতিফলন। মুসলমান জনগণের মতো হিন্দু জনগণও আরেক রকমভাবে এই সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সাড়া দিয়েছেন, মঙ্গলকাব্যসমূহ এবং বৈষ্ণব সাহিত্যে ঘটেছে তার প্রকাশ।

এই নবসৃষ্ট সাহিত্যকর্ম সমূহের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, তাতে নূতন সামাজিক চাহিদার জবাব রয়েছে। জনগণ যে ধরণের রসালো কাহিনী শুনতে আগ্রহী সে ধরণের কাহিনীই লেখকেরা পরিবেশন করেছেন। মুসলমান এবং হিন্দু সাহিত্যস্রষ্টারা আপনাপন সমাজের দিকে লক্ষ্য রেখেই সৃষ্টিকর্মে মনোনিবেশ করেছেন। মুসলমানদের তুলনায় হিন্দু কবিদের অনেকগুলো সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সুযুগ বিদ্যমান ছিল। প্রথমত আক্রমণমুখী বর্ধিষ্ণু মুসলমান সমাজের সঙ্গে সংঘাতে হিন্দু সমাজের তলা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। আত্মরক্ষার প্রয়োজনটাই তাঁদের কাছে বড় কথা। হিন্দু কবিরা এই সামাজিক ভীতির সঙ্গে একাত্মবোধ প্রকাশ না করে পারেননি। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে যখনই কোনো নতুন সামাজিক পরিবর্তন এবং নবতর মূল্যচেতনা সমাজের অভ্যন্তর থেকে সূচিত হয়েছে, তার প্রাণবস্তুটি সাহিত্য-স্রষ্টাদের কন্ঠে আপনা থেকেই কথা কয়ে উঠেছে। আর মুসলমান শাসনামলে হিন্দু সমাজের যে সামাজিক রূপান্তর ঘটছিল তাতে সংস্কৃতিগত ব্যবধান ছিল না, নিজেদের সংস্কৃতিকে নিজেদের প্রয়োজনে নতুনভাবে রূপদান করছিল। যেখানে বিষয় এবং বিষয়ীর সঙ্গে দুরত্ব বা বিরোধ নেই। সমাজের পূর্বার্জিত সামাজিক অভিজ্ঞতাসমূহকে পূর্ণবিশ্বাসে আত্ম-প্রত্যয়ের সঙ্গে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। মুসলমান পুঁথিলেখকদের তুলনায় হিন্দু কবিদের রচিত সাহিত্যকর্মে যে অধিক মানসিক পরিশ্রুত, পঠনপারিপাট্য এবং কান্ডজ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়, তার কারণ তাঁদের সম্পুর্ন অজানা একটি বিষয়ের প্রতি ধাবিত হতে হয়নি।

তুলনামুলক বিচারে মুসলমান পুঁথিলেখকদের হাতে সে পরিমাণ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধা ছিল না। প্রথমত তাঁদেরকে সম্পুর্ন অজানা একটি বিষয়কে প্রকাশ করতে হয়েছিল। ইসলাম ধর্মের আসল স্বরূপ, তার দার্শনিক প্রতীতি ইত্যাদি সম্বন্ধে মুসলমানদের আরবী-ফার্সীতে লেখা গ্রন্থসমূহ বদলে লোকশ্রুতি এবং দুরকল্পনার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।  একথাও সত্য যে পুঁথিলেখকদের অধিকাংশেরই আরবী-ফার্সী সম্বন্ধে কোনো জ্ঞান ছিল না। তাছাড়া হিন্দুদের দেব-দেবী এবং কাব্যোক্ত নায়ক-নায়িকাদের প্রতি মনে মনে একটি বিদ্বেষের দুরস্মৃতিও সক্রিয় ছিল। কেননা এই দেব-দেবীর পূজারীদের অত্যাচার এবং ঘৃণা থেকে অব্যাহতি পাবার আশায় তাঁদের পূর্বপুরুষেরা প্রথমে বৌদ্ধ এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তাই মুসলমান পুঁথিলেখকেরা তাঁদের রচনায় যখনই সুযোগ পেয়েছেন, এই দেব-দেবীর প্রতি তাচ্ছিল্য এবং ঘৃণা প্রকাশ করতে কুন্ঠাবোধ করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিন্দু সমাজের দেব-দেবী, নায়ক-নায়িকার প্রভাব থেকে তাঁদের মন মুক্ত হতে পারেনি। তাই তারা সচেতনভাবে এই দেব-দেবীর প্রতিস্পর্ধী নায়ক এবং চরিত্র যখন খাড়া করেছেন, এই সৃষ্ট চরিত্র সমূহের মধ্যেই দেব-দেবী নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছে। হজরত মুহম্মদ, হজরত আলী, আমির হামজা, মুহম্মদ হানিফা, বিবি ফাতেমা, জৈগুন বিবি এই চরিত্রসমূহ বিশ্বাসে এবং আচরণে, স্বভাবে-চরিত্রে যতদূর আরব দেশীয়, তার চাইতে বেশি এদেশীয়। তাঁদের মধ্যে যে বুদ্ধিমত্তা এবং হৃদয়াবেগ কাব্যলেখক চাপিয়ে দিয়েছেন তা একান্তভাবেই বঙ্গদেশে প্রচলিত দেব-দেবীর অনুরূপ। বাইরের দিক থেকে দেখলে হয়তো অতোটা মনে হবে না। কিন্তু গভীরে দৃষ্টিক্ষেপ করলে তা ধরা না পড়ে যায় না। বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতা সাহিত্যের দুই মুখ্য উপাদান। বিশ্বাস অভিজ্ঞতার নবরূপায়ণে সাহায্য করে। আলোকিত বিশ্বাস আলোকিত রূপায়ণ ঘটায় এবং অন্ধবিশ্বাস অন্ধ রূপায়ণ। মুসলমান পুঁথিলেখকদের বিশ্বাসের যে শক্তি তা অনেকটা অন্ধবিশ্বাস, কেননা ইসলামী জীবনবোধসমৃদ্ধ বিমূর্ত কোন ধারণা তাঁদের ছিল না। তাই তাদের শিল্পকর্ম অতটা অকেলাসিত। প্রতি পদে কল্পনা হোঁচট খেয়েছে বলে তাঁদের রচনার শক্তি নেই। আলাওল, দৌলত উজীর প্রমুখ মুসলাম কবি উৎকৃষ্ট কাব্যরচনা করতে পেরেছেন। তার কারণ তাঁদের কতিপয় সুযুগ ছিল। আলাওল নিজে আরবী, ফার্সী এবং সংস্কৃত সাহিত্যে সুপন্ডিত ছিলেন। কাব্যের স্বাভাবিকতা-অস্বাভাবিকতা সম্বন্ধে তাঁর পরিপূর্ণ বোধ ছিল। তদুপরি তিনি রাজসভায় বসে কাব্য রচনা করেছিলেন। রাজসভায় যে রুচিচর্চা এবং জীবনাদর্শের আলোচনা চলতে পারে, জনসভাতে তা চলে না। একই কথা দৌলত উজীর সম্বন্ধেও কম-বেশি প্রযোজ্য।

কিন্তু যে সকল মুসলমান কবিকে জনগণের ধর্মবোধ পরিতৃপ্ত এবং রক্তপিপাসা মিটাবার জন্য কলম ধরতে হয়েছিল, সেখানে কবি কী বলতে চান, কাদের জন্য বলতে চান এবং যা বলছেন তা অনুধাবনযোগ্য কিনা এইসব বিবেচনার বিষয় ছিল।


মুসলমান সমাজের কোন্‌ অংশের সামাজিক চাহিদা পূরণ করার জন্য এই পুঁথিসমূহ লেখা হয়েছিল এবং কারা লিখেছিলেন, তাঁদের বিদ্যাবত্তা এবং সংস্কৃতিক অগ্রগতি কতদূর ছিল - তলিয়ে বিচার করলে কতিপয় বিষয় স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। মূলত বাঙালী সমাজের যে শ্রেণীটি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং নতুন ধর্ম গ্রহণ করার কারণে, অধিকতর খোলাসা করে বলতে গেলে মুসলিম রাজশক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দরুণ, তাঁদের মধ্যে নতুন আকাঙ্খার উন্মেষ ঘটেছিল, সেই শ্রেণীটিই ছিল পুঁথিসাহিত্যের আদর সীমাবদ্ধ। তাঁরাই এর লেখক, পাঠক এবং সমাঝদার। তাছাড়া রোসাং ইত্যাদি রাজদরবারে বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের যে চর্চা হয়েছে, তাতে যে সকল মুসলিম কবি-সাহিত্যিক আশাতিরিক্ত সাফল্য প্রদর্শন করেছেন, জনগণের দৈনন্দিন জীবনধারার সঙ্গে তার সংযোগ খুব নিবিড় কিংবা গভীর ছিল না। রাজসভার বিদ্যাবত্তা, মার্জিত রুচি, বিলাসবহুল জীবনযাত্রার ধরনই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আলাওল প্রমুখ শক্তিমন্ত কবির কাব্য-ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল। আর কবিরাও ছিলেন বহুদর্শী পন্ডিত। আরবী, ফার্সী এবং সংস্কৃতি ভাষাতে ছিলেন সমান পারদর্শী। তাঁদের সাধনার মধ্যে কাব্যের ঔচিত্যবোধ জখম হয়নি বটে, কিন্তু জনগণের জীবনধারার সমতলে এসে চাহিদামতো কাব্যরচনাও তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। জনগণের সঙ্গে অনেকটা সম্পর্কহীন জ্যোৎস্নাভুক সৌন্দর্যবিলাসী ছিলেন বলেই তাঁদেরকে কাব্যের সামাজিক আদর্শ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে হয়নি। আরবী-ফার্সী থেকে যে কোনো কাহিনী অনুবাদ করে রসসমৃদ্ধ ভাষায় প্রকাশ করতে পারলেই তাঁদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যেত এবং তাঁদের সে যোগ্যতায় ঘাটতি ছিল না।

দো-ভাষী পুঁথিলেখকদের সমস্যা ছিল ভিন্নরকম। তাঁরা ছিলেন একই সঙ্গে জনগণের শিল্পী এবং শিক্ষক। পুঁথিসমূহের অনেকগুলো রচনার পিছনে সক্রিয় ছিল সামাজিক প্রয়োজন। এই প্রয়োজন পূর্ণভাবে পালন করার জন্য তিনটি উপাদান অপরিহার্যভাবে প্রয়োজনীয় ছিল। যে সামাজিক আদর্শটি তাঁরা প্রচার করতে যাচ্ছিলেন সে সম্বন্ধে সম্মক ধারণা এবং উপলব্ধি। যে সমাজে এই আদর্শ প্রচার করেছিলেন সেই বিশেষ সমাজটির লোক-সাধারণের সাংস্কৃতিক চেতনার মান; বিমূর্তভাবে নতুন সামাজিক আদর্শ ধারণ করার মতো মানসিক সাবালকত্ব অর্জন করেছে কিনা সে সম্বন্ধে একটা প্রাক-ধারণা এবং পূর্বের শিল্পাদর্শের অগ্রসর ধারাটির বিষয়ে তাঁদের উপযুক্ত জ্ঞান আর সেই ধারাটিকে সামাজিক প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য রেখে সম্পুর্ন নতুন একটি খাতে প্রবাহিত করার ক্ষমতা ছিল কিনা। এই তিনটি মৌল বিষয়ের কোনোটিই পর্যাপ্ত পরিমাণে পুঁথিলেখকদের সপক্ষে ছিল না। সামাজিক বীর এবং নায়ক সৃষ্টির মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের মহিমা কীর্তন করার উদ্দেশ্যেই তাঁদের বেশিরভাগ কাব্যসাধনায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ইসলাম সম্বন্ধে তাঁদের জ্ঞান কিছু লোকশ্রুতি, জনশ্রুতি, আউলিয়া দরবেশদের অলৌকিক ক্রিয়াকান্ড ইত্যাদির মধ্যেই সীমিত ছিল। আরবী-ফার্সী ভাষায় দখলের অভাবে অধিকাংশের ইসলাম বলতে একটা পাঁচমিশেলী ঝাপসা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল এবং তাঁদের রচিত সাহিত্যে সেই ধারণারই অভিব্যক্তি ঘটেছে। তাছাড়া যে সমাজের লোক-সাধারণের কাছে নতুন ধর্মের সারল্য এবং সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করছিলেন, সেই সমাজটির মানসিক পরিসর অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং সঙ্কুচিত ছিল। কেননা নিম্নবর্ণের অধিকাংশ হিন্দুই যুগ যুগ ধরে আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিপীড়িত হওয়ার ফলে মুক্তির আশায় প্রথমে বৌদ্ধ এবং পরে ইসলাম ধর্ম কবুল করেন। নতুন ধর্ম গ্রহণ ছিল একটি নির্যাতিত মানবগোষ্ঠীর আত্মরক্ষার অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত একটা ব্যবহারিক পদক্ষেপ। সুতরাং পূর্ববর্তী সমাজেও যে গরীয়ান একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিল, তাঁরা তার মর্মমধু পান করা থেকেও বঞ্চিত ছিলেন। আবার ইসলামী সমাজ এবং সংস্কৃতির যে একটা উন্নত উদার আদর্শ ছিল ঐতিহাসিক কারণে তাও তাঁরা অধিগত করতে পারেননি। এই অনগ্রসর জনসমাজ ইসলামের নামে যে সকল কাহিনী চাইতেন, সেই রকম কাহিনীই তাঁদের শোনাতে হত। আর পুঁথিলেখকরা ছিলেন এই জনগণেরই কন্ঠ।

এই সকল কারণে বাঙালী মুসলমান রচিত পুঁথিসাহিত্য উদ্ভট রসের অতি বেশি ছড়াছড়ি। হিন্দু মহাকাব্য এবং পুরাণসমূহের বীর-বীরাঙ্গনাদের চরিত্রের অপ্রভংশ মুসলিম কবিদের সৃষ্ট বীরদের মধ্যে নতুন করে জীবনলাভ করেছে। তাই পুঁথিসাহিত্যে অগ্রসরমানতার চাইতে প্রতিক্রিয়ার জের অধিক। মনের হীনম্মন্যতাবোধ থেকেই এই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি। এর পেছনে একগুচ্ছ ঐতিহাসিক কারণ বিদ্যমান। মুসলমান পুঁথিলেখকেরা সচেতনভাবে এক সামাজিক আদর্শ, একটি শিল্পাদর্শের বদলে আরেকটি শিল্পাদর্শের নির্মাণের প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নতুন শিল্পাদর্শটির চেহারা কিরকম হবে, জীবনের কোন্‌ মূল্যচেতনার বাহন হবে, অতীতের কতদুর গ্রহণ করবে, কতদুর বর্জন করবে, সে সম্বন্ধে তাঁদের মনে কোনো পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিল না। তাই তাঁরা অনেক সময় বহিরঙ্গের দিক দিয়ে নতুন সৃষ্টি করলেও, আসলে তা ছিল গলিত অতীতের রকমফের। উপলব্ধির বদলে বিক্ষোভ, পরিচ্ছন্ন চিন্তার বদলে ভাবাবেগই তাঁদের শিল্পদৃষ্টিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। এক সময়ে এই মুসলমানের পূর্বপুরুষেরা যে উঁচু বর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন, এই অপমানজনক দুরস্মৃতি বাইবেলের 'অরিজিনাল সীন' বা আদি পাপের ধারণার মতো তাঁদের মনে নিরন্তর জাগরুক থেকেছে। মুসলমান রচিত পুঁথি-সাহিত্যের প্রতিক্রিয়াশীলতা আসলে সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতারই সাহিত্যিক রূপায়ণ। সে বিষয়ে কোন স্পষ্ট ধারণা পোষণ করতে হলে এই অপমানজনক দুরস্মৃতির বিষয়টি স্মরণে রাখার প্রয়োজন আছে। মুসলিম শাসনের অবসানের পর এই সামাজিক প্রতিক্রিয়া আরো গভীর এবং অন্তর্মুখী রূপ পরিগ্রহণ করে। এই প্রতিক্রিয়ার জের বাঙালী মুসলমান সমাজে এত সুদুরপ্রসারী হয়েছে যে ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী গদ্য-লেখক মীর মশাররফ হোসেনের সুবিখ্যাত 'বিষাদ সিন্ধু' গ্রন্থটিতেও 'শহীদে কারবালা' পুঁথির ব্রাহ্মণ আজরকে একই চেহারায়, একই পোশাকে, একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সময়ের পালাবদলের ব্যাপারটি এই অত্যন্ত শক্তিধর লেখকের মনে সামান্যতম আঁচড়ও কাটতে পারেনি। পুঁথিলেখকের কান্ডজ্ঞানহীনতাকে তিনিও বরণ করে নিয়েছেন।


যেহেতু নবদীক্ষিত মুসলমানদের বেশিরভাগই ছিলেন নিম্নবর্ণের হিন্দু, তাই আর্য সংস্কৃতিরও যে একটা বিশ্বদৃষ্টি এবং জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে যে একটা প্রসারিত বোধ ছিল, বর্ণাশ্রম ধর্মের কড়াকড়ির দরুণ ইসলাম কিংবা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণের পূর্বে সে সম্বন্ধে তাঁদের মনে কোনো ধারণা জন্মাতে পারেনি। পাশাপাশি ইসলামও যে একটা উন্নততর দীপ্ত ধারার সভ্যতা এবং মহীয়ান সংস্কৃতির বাহন হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে একটা সামাজিক বিপ্লব সংসাধন করেছিল, বাঙালী মুসলমানের মনে তার কোনো গভীরাশ্রয়ী প্রাভাবও পড়েনি বললেই চলে। প্রথমত, ভারতে ইসলাম প্রচারে মধ্যপ্রাচ্যের সুফী দরবেশদের একটা গৌণ ভূমিকা ছিল বটে, কিন্তু লোদী, খিলজী এবং চেঙ্গিস খানের বংশধরদের সাম্রাজ্য বিস্তারই ইসলাম ধর্মের প্রসারের যে মূখ্য কারণ, তাতে কোনো সংশয় নেই। এই পাঠান-মোগলদের ইসলাম এবং আরবদের ইসলাম ঠিক একবস্তু ছিল না। আব্বাসীর খলীফাদের আমলে বাগদাদে, ফাতেমীয় খলীফাদের আমলে উত্তর আফ্রিকায় এবং উমাইয়া খলীফাদের স্পেনে যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হয়েছিল, ভারতবর্ষে তা কোনোদিন প্রবেশাধিকার লাভ করেনি। মুসলমান বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকদের যে অপ্রতিহত প্রভাব ইউরোপীয় রেনেসাঁকে সদ্ভাবিত করে তুলেছিল, ভারতের মাটিতে সে যুক্তিবাদী জ্ঞানচর্চা একেবারেই শিকর বিস্তার করতে পারেনি। খাওয়া-দাওয়া, সঙ্গীতকলা, স্থাপত্যশিল্প, উদ্যান রচনা এবং ইরান, তুর্কীস্থান ইত্যাদি দেশের শাসনপদ্ধতি এবং দরবারী আদব-কায়দা ছাড়া অন্য কিছু ভারতবর্ষ গ্রহণ করেনি।

তদুপরি, এই ভারতবর্ষের লক্ষ্নৌ, দিল্লী ইত্যাদি অঞ্চলে ইসলামের যেটুকু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হয়েছে, বাঙলা মুলুকে তার ছিটেফোঁটাও পৌছাতে পারেনি। যে মুসলিম শাসকশ্রেণীটি নানা সময়ে বাঙলা দেশ শাসন করতেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন বিদেশী। রক্ত এবং ভাষাগত দিক দিয়ে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাঁদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। অনেকটা ইউরোপীয় শাসকদের মতো সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই তাঁরা বসবাস করতেন এবং নতুন পোশাক-আশাক, ফ্যাশান ইত্যাদির জন্য দিল্লী কিংবা ইরানের দিকে সাগ্রহে তাকিয়ে থাকতেন। এই উঁচুকোটির মুসলিম শাসকবর্গ যাঁদের হাতে অধিকাংশ শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব অর্পিত ছিল, তাঁরা স্থানীয় জনগণের স্বাভাবিক নেতা ছিলেন না। এই উঁচুকোটির মুসলমান প্রশাসকেরা এদেশীয় যে শ্রেণীটির সহায়তায় বাঙলা দেশে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন, তাঁরা প্রায় সকলেই ছিলেন স্থানীয় উঁচু বর্ণের বাঙালী ব্রাহ্মণ, কায়স্থ কিংবা বৈদ্য শ্রেণীর লোক। যখনই প্রয়োজন পড়েছে কিংবা ব্রাহ্মণ শ্রেণীর আনুগত্য সম্বন্ধে মনে সন্দেহ জেগেছে তাঁরা অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তর থেকে খেলাত এবং পদবী বিতরণ করে আরেকটি নেতৃশ্রেণী সৃষ্টি করেছেন। 'খাসনবীস', 'মহলানবীস', 'দেওয়ান', 'রায়রায়ান', 'বখসী', 'মুন্সী', 'দস্তিদার' ইত্যাদি পদবীতেই তার প্রমাণ মেলে। বাঙলার স্থানীয় মুসলমানেরা কদাচিৎ বিদেশী মুসলমান শাসকদের সঙ্গে শাসনতান্ত্রিক কর্মে সহায়তা করার সুযোগ লাভ করেছেন। তার কারণ ছিল, একটি রাজশক্তির সঙ্গে সহায়তা করার জন্য যে পরিমাণ নিরাপদ আর্থিক ভিত্তির প্রয়োজন বাঙালী মুসলমানদের তা ছিল না। মুসলিম রাজশক্তি এই দেশের সমাজ-কাঠামোর মধ্যে অতি সামান্যই রূপান্তর এনেছিল। তাঁরা অনেকটা নির্বিবাদেই পূর্বতন সমাজ-কাঠামোকে গ্রহণ করেছিল। পরিবর্তন ততটুকুই করেছিল, যতটুকু তাঁদের প্রয়োজন। অর্থাৎ পূর্বেকার শাসক নেতৃশ্রেণীর শূণ্যস্থানটিই তাঁরা পূর্ণ করেছিলেন। মুসলিম শাসনের পূর্বে যে সমাজব্যবস্থাটি চালু ছিল, পরেও সেই একই সমাজব্যবস্থা চালু থেকেছে। তার মধ্যে কোনো মৌলিক রূপান্তর বা পরিবর্তন তাঁরা আনতে পারেননি। তাই নতুন ধর্ম গ্রহণ করার পরেও স্থানীয় মুসলমানরা ইংরেজ আমলের দিশী খৃষ্টানদের মতো একটা উন্মত্ত গর্ববোধ ছাড়া ইসলামী কিংবা আর্য সংস্কৃতির কিছুই লাভ করতে পারেননি। তাই খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, মুসলমান আমলেও যাঁরা শাসনতান্ত্রিক প্রয়োজনে ফার্সী ভাষা শিক্ষা করেছেন, তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ের উঁচু বর্ণের লোক। বাঙালী মুসলমাদের অবস্থার, পেশার এবং রুচির বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ইসলাম গ্রহণের ফলে তাঁরা কতিপয় মোটা অভ্যাস বর্জন করে কতিপয় মোটা অভ্যাসকে গ্রহণ করেছিলেন। যেহেতু সংখ্যাগত দিক দিয়ে তাঁরা ছিলেন অনেক, উৎপাদন পদ্ধতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিলেন এবং রাজশক্তি সময়ে-অসময়ে তাঁদের প্রতি আনুকুল্য প্রদর্শন করতেন, এই সকল কারণের দরুণ তাঁদের মধ্যে দ্রুত একটা সামাজিক আকাঙ্খা জন্মলাভ করেছিল। পুঁথিসাহিত্যের মধ্যে এই আকাঙ্খাই পূর্ণ দৈর্ঘ্যে মুক্তিলাভ করেছে।

বাঙালী মুসলমানের মন - ২ : আহমদ ছফা

বাঙালী মুসলমানের মন - ২ : আহমদ ছফা



5
এই পুঁথিসমূহের দো-ভাষী অর্থ্যাৎ বাংলা এবং আরবী-ফার্সী মিশ্রিত হওয়ার পেছনে একটি অত্যন্ত দূরবর্তী ঐতিহাসিক কারণ বর্তমান। হাদীসে তিনটি কারণে অন্যান্য ভাষার চাইতে আরবীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথম হলো কোরআনের ভাষা আরবী, দ্বিতীয় কারণ বেহেশতের অধিবাসীদের ভাষা আরবী এবং তৃতীয়ত হজরত মুহম্মদ নিজে একজন আরবীভাষী ছিলেন। এই তিনটি মুখ্য কারণে যে সমস্ত দেশে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে, সেখানে অপ্রতিরোধ্যভাবে এই ভাষাটিরও অণুপ্রবেশ ঘটেছে। আরব অধিকারের পূর্বে মিশর এবং আফ্রিকার দেশসমূহের নিজস্ব ভাষা এবং বর্ণমালা দুই-ই ছিল। কিন্তু আরব অধিকারে আসার পর আরবী ভাষা এবং বর্ণমালা দুইটিকেই অধিবাসীদের গ্রহণ করতে হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে আরবী ভাষা এবং ইসলাম অনেকটা অভিন্নার্থক ছিল। আরবী ভাষাকে গ্রহণ না করে ইসলাম গ্রহণ করলে প্রকৃত মুসলমান হওয়া যাবে না, সে সময় এরকম একটা প্রবল মত অতিমাত্রায় সক্রিয় ছিল। অন্য যে-কোনো সেমিটিক ধর্মের মতো ইসলামেও পরলৌকিক জীবনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। সারাজীবন মুসলমান হিসেবে জীবন কাটিয়ে পরকালে বেহেশতে যেয়েও ভাষাজ্ঞানের অভাবে একঘরে জীবন কাটাতে হবে এটা ধর্মপ্রাণ মুসলমান মত্রেরই সহ্যের অতীত একটা ব্যাপার। তাই মিশর থেকে শুরু করে মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলের অধিবাসীরা আরবী ভাষা এবং বর্ণমালা দুটিই গ্রহণ করেছিল।

মিশোরে যেভাবে সহজে আরবী ভাষা জনগণের কাছে গ্রহণীয় হয়ে উঠতে পেরেছে, ইরানে তেমনটি হতে পারেনি। কারণ ইরানীরা ছিলেন অতিমাত্রায় ঐতিহ্য-সচেতন এবং সংস্কৃতিগত-প্রাণ জাতি। তাঁদের মহীয়ান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে এ যুক্তি উদ্ধার করতে বিশেষ বেগ পেতে হয়নি যে আরবী ভাষা না আয়ত্ব করেও প্রকৃত মুসলমান হওয়া যায়। কোরানের প্রকৃত শিক্ষা তাঁদের নিজস্ব ভাষায় বিকশিত করে তোলার মতো ভাষাগত সমৃদ্ধি এবং মনীষা দুই-ই তাঁদের ছিল। আরবী ভাষাকে গ্রহণ-বর্জন প্রশ্নে ইরানী সমাজ যে একটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছিল, কবি ফেরদৌসী, দার্শনিক ইমাম গাজ্জ্বালী প্রমুখ তা গ্রহণ করেছিলেন। ইরানীরা আরবী ভাষা গ্রহণ করেননি, কিন্তু আরবী বর্ণমালা তাঁদের মেনে নিতে হয়েছে। তারপর ইরান থেকে শুরু করে আফগানিস্তান পেরিয়ে ভারতবর্ষ অবধি মুসলিম শক্তির যে জয়যাত্রা সূচিত হয়েছে তার পেছন পেছন ফার্সী ভাষাও ভারতে প্রবেশ করেছে। এমনকি মোগল বিজেতারা তাঁদের মাতৃভাষা তুর্কীর পরিবর্তে ফার্সীকেই সরকারী ভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। মিশরে আরবী যেমন, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশে ফার্সী যেমন চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে, ভারতবর্ষে সেভাবে অনেকদিন রাজভাষা থাকার পরও ফার্সীকে চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ভারতের হিন্দুরা বড় আশ্চর্য জাত; তাঁরা দরবারে চাকরী করার জন্য উত্তমরূপে ফার্সীভাষা শিক্ষা করেছেন, 'দিল্লীশ্বরো বা জগদীশ্বরো' উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু নিজেদের ভাষা বাদ দিয়ে কখনো ঐ ভাষাটিকে গ্রহণ করেননি। সুতরাং ভারতে ফার্সী ছিল জনগণের দৈনন্দিনতার স্পর্শলেশবর্জিত দরবারবিহারী একটি অভিজাত শ্রেণীর ভাষা। স্থানীয় মুসলিম জনগণের মধ্যেও তার বিশেষ প্রসার ঘটেনি। স্বাতন্ত্র্যগর্বী মুসলমানেরা নিজেদের প্রয়োজনে ফার্সী বর্ণমালাকে গ্রহণ করে ভারতীয় ভাষাসমূহের সমন্বয়ে উর্দু নামে একটা পাঁচমিশালী ভাষা তৈরি করেছেন। ইউরোপীয় পন্ডিতেরা যেমন রেনেসাঁর যুগে জাতীয় ভাষাসমূহের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের পূর্বে ল্যাটিন ভাষাতে সন্দর্ভ ইত্যাদি রচনা করতেন, তেমনি মুসলমান ধর্মবেত্তারা ধর্মগ্রন্থসমূহের টীকা-টিপ্পনী ফার্সী ভাষাতেই রচনা করতেন। সৈয়দ আহমদের আলীগড় আন্দোলনের পর উর্দু ভাষাতে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয় এবং ঐ ভাষাতেই ধর্মীয় সন্দর্ভসমূহ লেখা হতে থাকে।

বাঙালী মুসলমানের চোখে ফার্সী এবং উর্দু দুটো আরবীর মতোই পবিত্র ছিল। আর এ দুটো রাজভাষা এবং শাসক নেতৃশ্রেণীর ভাষা হওয়ায়, তাদের শ্রদ্ধা নিশ্চয়ই আনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু এ দুটির একটিকেও পরিপূর্ণভাবে রপ্ত করার জন্য একটি সমাজের পেছনে যে শক্ত আর্থিক ভিত্তি এবং সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ থাকা প্রয়োজন ছিল দুটির কোনোটিই তাঁদের ছিল না। কলকাতার পার্ক স্ট্রীট এলাকার এ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা যে ধরণের ইংরেজি বলেন কিংবা ঢাকার কুট্টি অধিবাসীরা যে উর্দু বলেন ততটুকু ভাষাজ্ঞান অর্জন করাও সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণে তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেননা এ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে ইংরেজ এবং ইংরেজি ভাষার আর ঢাকার কুট্টিদের সঙ্গে উর্দু এবং নবাবদের সামাজিক মেলামেশার যে সুযোগ ছিল, বাঙলার আপামর জনগণের সঙ্গে উর্দু-ফার্সী জানা শাসক নেতৃশ্রেণীর ততটুকুও সামাজিক মেলামেশার সুযোগ ছিল না। কিন্তু বাঙালী মুসলমানেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুসারে আরবী, ফার্সী এবং উর্দু এই তিনটা ভাষার তালিম গ্রহণ করার প্রাণান্তকর প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। আরবী, ফার্সী এবং উর্দু ভাষাটাও যখন তাঁদের পক্ষে পরিপূর্ণভাবে রপ্ত করা অসম্ভব মনে হয়েছে তখন ঐ বর্ণমালাতে বাংলা লেখার চেষ্টা করেছেন। এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে নেয়ার আছে, কোনো ব্যক্তি বিশেষ একটা ভাষা রপ্ত করতে পারেন, কিন্তু সেটা সামাজিকভাবে রপ্ত করা বলা চলে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকেও আরবী হরফে বাংলা পুঁথিপত্র যে লেখা হয়েছে সেটাকে ক'জন অবসরভোগী পুঁথিলেখকের নিছক খেয়াল মনে করলে ভুল করা হবে। আসলে তা ছিল বেহেশতের ভাষার প্রতি কৃতজ্ঞতা নিবেদনের অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। যখন দেখা গেল আরবী হরফে বাংলা লিখেও সমাজে চালু করা যায় না তখন পুঁথিলেখকেরা সবান্ধবে পরবর্তী পন্থাটা অনুসরণ করতে থাকলেন। বাংলা ভাষার সঙ্গে এন্তার আরবী-ফার্সী শব্দ মিশেল দিয়ে কাব্য রচনা করতে আরম্ভ করলেন। জনগণ তাঁদের এই ভাষাটিকে গ্রহণও করেছিলেন। কিন্তু কোন্‌ জনগণ? এঁরা ছিলেন সেই জনগণ, সংস্কৃত ভাষা যাঁদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল, আরবী অজানা, ফার্সীর নাম শুনেছেন এবং উর্দু ভাষা কানে শুনেছেন মাত্র।

সুযোগ পেলে তাঁরা আরবীতে লিখতেন, নইলে ফার্সীতে, নিদেন পক্ষে উর্দুতে। কিন্তু যখন দেখা গেল এর একটাও সামাজিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয় তখন বাধ্য হয়েই বাংলা লিখতে এসেছেন। কেউ কেউ সন্দ্বীপের আবদুল হাকিমের সেই 'যেসব বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সেসব কাহার জন্ম নির্ণএ ন জানি' পংক্তিগুলো আউড়ে বলে থাকেন যে নিজেদের ভাষার প্রতি পুঁথিলেখকদের অপরিসীম দরদ ছিল। কথাটা সম্পূর্ন সত্য নয়। আবদুল হাকিমের এই উক্তির মধ্যে একটা প্রচন্ড ক্ষোভ এবং মর্মবেদনা লক্ষ্য করা যায়। নিশ্চয়ই সে সময়ে এমন লোক ছিলেন যাঁরা সত্যি সত্যি বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করতেন। আবদুল হাকিম নিজে সে শ্রেণীভুক্ত নন, তাই সে উঁচু ভাষাতে তাঁর অধিকারও নেই। তাই তিনি তাঁর একমাত্র আদি এবং অকৃত্রিম ভাষাতেই লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছেন।

দূর অতীতের কথা বলে লাভ নেই। ফরিদপুরের নবাব আবদুল লতিফও মুসলমান সমাজের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে উর্দু ভাষার সুপারিশ করেছিলেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক যিনি ছিলেন বাংলার প্রথম আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন, রাজনীতিবিদ, তিনিও বাড়িতে উর্দু ভাষায় কথাবার্তা বলতেন। ঢাকার কুট্টি অধিবাসীদের অনেকেই অনেকদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সক্রিয় বিরোধিতা করেছেন। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে থেকে একটি সত্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসে, তা হলো বাঙালী মুসলমানদের অধিকাংশেরই মধ্যে আরবী, ফার্সী, উর্দু ইত্যাদি ভাষার প্রতি একটা অন্ধ অনুরাগ অনেক দিন পর্যন্ত বিরাজমান ছিল।


পলাশীর যুদ্ধের পর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী অনুসৃত নীতির ফলে যে উঁচুকোটির মুসলিম শাসক নেতৃশ্রেনীটি ছিল তার অবস্থা একেবারে শোচনীয় হয়ে পড়ে। ভাষাগত দিক দিয়ে তাঁরা বাঙালী মুসলমান জনগণের সঙ্গে কোনরকমে সম্পর্কিত ছিলেন না। এ দেশে অনেকটা বিদেশীর মতোই অবস্থান করতেন। সরকারী চাকুরীই ছিল তাঁদের এই দেশে অবস্থান করার মুখ্য অবলম্বন। নবাবী আমলের অবসানের পর যখন ইংরেজ শাসন কায়েম হলো তাঁরা না পারলেন ইংরেজদের সঙ্গে সহযোগিতা করতে, না পারলেন নিজেদের ধর্মীয় জনগণের নেতৃত্বদান করতে। রক্তগত, ভাষাগত, রুচি, সংস্কৃতি এবং আচরণগত ব্যবধানের দরুণ আপদকালে সমাজের নেতৃশ্রেণীর পালনীয় যে ভূমিকা রয়েছে, বাঙলা দেশে অবস্থানকারী অভিজাত মুসলিম শ্রেণীটির তা পালন করার কথা একবারও মনে আসেনি।

কিন্তু উত্তর ভারতে হয়েছে সম্পূর্ন উল্টো। সেখানেও মুসলিম নেতৃশ্রেণীটি মোগল শাসনের অবসানের পরে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। অত্যল্পকাল গত না হতেই স্যার সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে তাঁরা নতুন ব্যবস্থাকে মেনে নেয়ার জন্য এবং নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াবার জন্য মনন এবং মানসিকতার পরিবর্তনে লেগে যান। তার ফলশ্রুতি আলীগড় কলেজ। এই কলেজের সবচেয়ে প্রনিধানযোগ্য যে অবদান তা হলো মুসলিম নেতৃশ্রেণীকে পুঞ্জীভূত হতাশা থেকে উদ্ধার করে ব্রিটিশমুখী করা। ব্রিটিশ শাসকদেরও সিপাহী যুদ্ধের সংশয়-সন্দেহের কুজ্‌ঝটিকা সরিয়ে মুসলিমমুখী করে তোলার ব্যাপারে, ব্যক্তিগতভাবে স্যার সৈয়দ আহমদ নিজে, তাঁর বন্ধু এবং অনুরাগীবর্গ ও প্রতিষ্ঠিত আলীগড় কলেজ বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। তাই সেখানে মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও লেখাপড়া, ব্যবসা-বাণিজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের চাইতে অপেক্ষাকৃত অগ্রসর ছিলেন। আসলে স্যার সৈয়দ আহমদ মুসলমানদের ব্রিটিশ শাসকদের কাছ থেকে সুযোগ নেয়ার পদ্ধতিটা ভালোভাবে শিখিয়েছিলেন। তার চিন্তা সারা ভারতের শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যে এত বেশি শেকড় বিস্তার করেছিল যে আলীগড়-শিক্ষিত মুসলমানেরা কদাচিৎ সুযোগসন্ধানী নীতি পরিহার করতে পেরেছিল; কেননা জনগণ এবং অভিজাত শ্রেণীর মধ্যে ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, রুচি ও আচারগত শ্রেণীদূরত্ব ছাড়া অন্য কোনো দুরত্ব ছিল না। কিন্তু বাঙলা দেশে ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ন ভিন্নরকম। ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিজাত শ্রেণী একেবারে তলিয়ে গেল। কিন্তু তাঁদের আচার-আচরণ, সামাজিক আদর্শ অটুট থেকে গেল। হিন্দু সমাজের প্রতিযোগিতা এড়িয়ে ব্রিটিশ শাসকদের কৃপাকণা সম্বল করে যে সকল মুসলমান ওপরের দিকে উঠে আসতেন, মৃত মুসলিম অভিজাতদের আদর্শকেই তাঁদের নিজেদের আদর্শ বলে বরণ করে নিতেন। এঁরা আবার অনেক সময় আপন মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষার জন্য স্যার সৈয়দ আহমদ যা করেছেন বাঙলা দেশের মুসলমানদের জন্য একই কাজ করা উচিত মনে করতেন।

প্রায়শ হালের একগুঁয়ে ইতিহাস-ব্যাখ্যাকারকদের মধ্যে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা বলে থাকেন, ব্রিটিশ শাসনের আমলে বাঙলার মুসলমান সমাজ অধঃপতনের গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এটা পুরো সত্য তো নয়ই, সিকি পরিমাণ সত্যও এর মধ্যে আছে কিনা সন্দেহ। সত্য বটে, মুসলিম শাসনের অবসানের পর শাসক নেতৃশ্রেণীটির দুর্দশার অন্ত ছিল না। কিন্তু তাদের সঙ্গে সাধারণ বাঙালী মুসলমান জনগণের একমাত্র ধর্ম ছাড়া অন্য কোনো যোগসূত্র ছিল কি? আর মুসলমান জনগণের অবস্থা ইংরেজ শাসনের পূর্বে অধিকতর ভালো ছিল কি? নবাবী আমলেও এ দেশীয় ফার্সী জানা যা সকল কর্মচারী নিয়োগ করা হত, তাঁদের মধ্যে স্থানীয় হিন্দু কত জন ছিলেন এবং কত জন ছিলেন স্থানীয় মুসলমান, এ সকল বিষয় বিচার করে দেখেন না বলেই অতি সহজে অপবাদের বোঝাটি ইংরেজদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাঁরা দায়িত্বমুক্ত মনে করেন।

উত্তর ভারতেও মুসলিম শাসক নেতৃশ্রেণী একইভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন, অধিকন্তু তাঁদের অনেকেই সিপাহী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার পরেও তাঁরা কী করে এগিয়ে আসতে পারেন এবং তাঁদের মধ্যে কেন সৃষ্টি হলো স্যার সৈয়দ আহমদের মতো একজন মানুষ? বাঙলা দেশের মুসলমানদের মধ্যে তেমন একজন মানুষ জন্মালেন না কেন? এই সকল বিষয়ের সদুত্তর সন্ধান করলেই বাঙালী মুসলমানের যে মৌলিক সমস্যা তার মূলে যাওয়া যাবে।

বাঙালী মুসলমান কারা? এক কথায় এর উত্তর বোধ করি এভাবে দেয়া যায় : যারা বাঙালী এবং একই সঙ্গে মুসলমান - তাঁরাই বাঙালী মুসলমান। এঁদের ছাড়াও সুদূর অতীত থেকেই এই বাঙলা দেশের অধিবাসী অনেক মুসলমান ছিলেন - যাঁরা ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যানুসারে ঠিক বাঙালী ছিলেন না। আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধাগুলো তাঁদের হাতে ছিল বলেই বাঙালী মুসলমানের সঙ্গে কৃষ্টি-সংস্কৃতিগত ভেদরেখাসমূহ অনেকদিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই প্রভুত্বশীল অংশের রুচি, জীবনদৃষ্টি, মনন এবং চিন্তন-পদ্ধতি অনেকদিন পর্যন্ত বাঙালী মুসলমানের যে ক্ষুদ্রতম অংশ কোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে গলে যখন সামাজিক প্রভুত্ব এবং প্রতাপের অধিকারী হতেন, তখনই বাঙালী মুসলমানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক চুকে যেত এবং উঁচু শ্রেণীর অভ্যাস, রুচি, জীবনদৃষ্টির এমনকি ভ্রমাত্মক প্রবণতাসমূহও কর্ষনে-ঘর্ষণে নিজেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অঙ্গীভূত করে নিতেন।

মূলত বাঙালী মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি মানবগোষ্ঠী। এই অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হলো, এঁদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তাঁরা ছিলেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাঁদের কোনো মতামত বক্তব্য ছিল না। একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাঙলা মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল। যেমন কল্পনা করা হয়, অত সহজে এই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হতে পারেনি। বাঙলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা যে সর্বপ্রকারে ওই বিদেশী উন্নততর শক্তিকে বাধা দিয়েছিল - ছড়াতে, খেলার বোলে অজস্র প্রমাণ ছড়ানো রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ট আর্য শক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর বিশ্ববিশ্রুত 'ভারতের ধর্মসমূহ' গ্রন্থে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। আর্য অথবা ব্রাহ্মণ্য শক্তি যে সকল জনগোষ্ঠীকে পদদলিত করে এদেশে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতহয়েছে, তাঁদেরকে একেবারে চিরতরে জন্ম-জন্মান্তরের দাস চিহ্নিত করেছে। আর যে সকল শক্তি ওই আর্য শক্তিকে পরাস্ত করে ভারতে শাসনক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন, তাঁদের সকলকেই মর্যাদার আসন দিতে কোনো প্রকারের দ্বিধা বা কুন্ঠা বোধ করেনি। শক, হুন, মোগল, পাঠান, ইংরেজ যাঁরাই এসেছেন এদেশে তাঁদের সহায়তা করতে পেছপা হয়নি। কিন্তু নিজেরা বাহুবলে যাঁদের পরাজিত করেছিল, তাঁরাও যে মানুষ একথা স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা খুব অল্পই অনুভব করেছে। তবু ভারতবর্ষে এমনকি এই বাঙলা দেশেও যে, কোনো কোনো নীচু শ্রেণীর লোক নানা বৃত্তি এবং পেশাকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে ওপরের শ্রেণীতে উঠে আসতে পেরেছেন তা অন্যত্র আলোচনার বিষয়।

বাঙলা দেশের এই পরাজিত জনগোষ্ঠী যাঁদেরকে রাজশক্তি পাশবিক শক্তির সাহায্যে অন্ত্যজ করে রেখেছিল, তাঁদেরই সকলে এক সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে সে প্রাথমিক পরাজয়ের কথঞ্চিত প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিল। শঙ্করাচার্যের আবির্ভাবের ফলে প্রাচীন আর্যধর্মের নবজীবন প্রাপ্তির পর বৌদ্ধদের এদেশে ধনপ্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা যখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল, তার অব্যবহিত পরেই এ দেশে মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা হয় এবং ভীত-সন্ত্রস্ত বৌদ্ধরা দলে-দলে ইসলাম ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করে। হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এদেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিতম উৎস। কেউ কেউ অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকেই সাম্প্রদায়িকতার জনয়িতা মনে করেন। তাঁরা ভারতীয় ইতিহাসের অতীতকে শুধুমাত্র ব্রিটিশ শাসনের দুশো বছরের মধ্যে সীমিত রাখেন বলেই এই ভুলটা করে থাকেন।


বাঙালী মুসলমানেরা শুরু থেকেই আর্থিক-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদেই ক্রমাগত ধর্ম পরিবর্তন করে আসছিলেন। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনের কারণে তাঁদের মধ্যে একটা সামাজিক প্রভুত্ব অর্জনের উন্মেষ হলেও জাগতিক দুর্দশার অবসান ঘটেনি। বাঙলা নতুন নতুন রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধর্মালম্বীর সংখ্যা আশাতীত হারে বৃদ্ধিলাভ করেছে। যেহেতু মৌলিক উৎপাদন পদ্ধতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেনি, তাই রাজশক্তিকেও পুরনো সমাজ-সংগঠনকে মেনে নিতে হয়েছে। সে জন্যেই মুসলিম শাসনামলেও বাঙালী মুসলমানেরা রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিগৃহীত ছিলেন। ইংরেজ আমলে উঁচু শ্রেণীর মুসলমানরা সম্পূর্নভাবে সামাজিক নেতৃত্বের আসন থেকে বিতাড়িত হলে উঁচু বর্ণের হিন্দুরা স্বাভাবিকভাবেই সে আসন পূরণ করেন।

বাঙালী মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজের লোক। তাঁদের মানসিকতার মধ্যে আদিম সমাজের চিন্তন পদ্ধতির লক্ষণসমূহ সুপ্রকট। বারবার ধর্ম পরিবর্তন করার পরেও বাইরের দিক ছাড়া তাঁদের বিশ্বাস এবং মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দিনের পর দিন গিয়েছে, নতুন ভাবাদর্শ এদেশে তরঙ্গ তুলেছে, নতুন রাজশক্তি এদেশে নতুন শাসনপদ্ধতি চালু করেছে, কিন্তু তাঁরা মনের দিক দিয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতোই বারবার বিচ্ছিন্ন থেকে গিয়েছেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালী মুসলমান এবং মুসলমান রাজত্বের সময়ে তাঁদেরই মানসে যে একটি বলবন্ত সামাজিক আকাঙ্খা জাগ্রত হয়েছিল তাঁদেরই রচিত পুঁথিসাহিত্যসমূহের মধ্যে তার প্রমাণ মেলে। কাব্যসাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক বিচার অনুসারে হয়তো এ সকল পুঁথির বিশেষ মূল্য নেই, কিন্তু বাঙালী মুসলমান সমাজের নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এসবের মূল্য যে অপরিসীম সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইতালীয় দার্শনিক বেনেদিত্তো ক্রোচের মতে প্রতিটি জাতির এমন কতিপয় সামাজিক আবেগ আছে যার মধ্যে জাতিগত বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্যাসের আকারে পুরোমাত্রায় বিরাজমান থাকে। রাজনৈতিক পরাধীনতার সময় সে আবেগ সাপের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং কোনো রাজনৈতিক এবং সামাজিক মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হলে সে আবেগই ফণা মেলে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। সাহিত্যেই প্রথমে এই জাতিগত আকাঙ্খার রূপায়ণ ঘটতে থাকে। জাতিগত আকাঙ্খার সঙ্গে যুক্ত হতে না পারলে কোনো মহৎ সাহিত্য যে সৃষ্টি হতে পারে না, একথা বলাই বাহুল্য।

পুঁথিসাহিত্যের মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, বাঙালী আদিম কৃষিভিত্তিক কৌম-সমাজের মনটি রাজশক্তির আনুকূল্য অনুভব করে হুঙ্কার দিয়ে ফণা মেলে জেগে উঠেছে। কিন্তু ঐ জেগে ওঠাই সার, সে মন কোনো পরিণতির দিকে ধাবিত হতে পারেনি। প্রতিবন্ধকতাসমূহ সামাজিক সংগঠনের মতোই বিরাজমান ছিল। সমাজ-সংগঠন ভেঙ্গে ফেলে নবরূপায়ণ তাঁরা ঘটাতে পারেননি। কারণ মুসলিম শাসকেরাও স্থানীয় জনগণের মধ্যে থেকে যে নেতৃশ্রেণী সংগ্রহ করেছিল, তাদের মধ্যে বাঙালী মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব একেবারে ছিল না বললেই চলে। অন্যদিকে ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, রুচি এবং আচারগত দুরত্বের দরুণ শাসকশ্রেণীর অভ্যাস, মনন রপ্ত করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বাঙালী মুসলমান।

ইংরেজ শাসন কায়েম হওয়ার পরে এই দেশে হিন্দুসমাজের ভেতর থেকে যে একটি মধ্যবিত্ত নেতৃশ্রেণী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তার মধ্যে মুসলমান সমাজের প্রতিনিধিত্ব না থাকার কারণ হিসেবে শুধুমাত্র ব্রিটিশের 'ডিভাইড এ্যান্ড রুল পলিসি' কিংবা মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি ইংরেজের অন্ধবিদ্বেষকে ধরে নিলে মুসলিম সমাজের তুলনামূলক পেছনে পড়ে থাকার কারণসমূহের সঠিক ব্যাখ্যা করা হবে না।


ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের উত্থান যুগে ইউরোপীয় ভাবধারা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং নানা আধুনিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক চিন্তারাশি বঙ্গীয় হিন্দু সমাজের একাংশের মধ্যে যে তরঙ্গ তুলেছিল, তা মুসলমান সমাজকে স্পর্শও করতে পারেনি। আধুনিক যুগের দাবীর সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে যে সকল ধর্মীয় এবং সামাজিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক মূল্যচেতনার নেতৃত্ব হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী দান করেছিল, মুসলমান সমাজে তা একেবারে প্রসার লাভ করেনি। জগত এবং জীবনের যে সকল অত্যাবশ্যকীয় প্রশ্ন নবযুগের আলোকে তাঁরা ঝালিয়ে নিচ্ছিলেন, মুসলমান সমাজ তার কিছুই গ্রহণ করেনি। সে সময়ে স্যার সৈয়দ আহমদ, সৈয়দ আমীর আলী, নওয়াব আবদুল লতিফ প্রমুখ যে সকল মুসলিম চিন্তানায়ক মুসলমানদের হয়ে কথা বলছিলেন এবং চিন্তা করছিলেন, মুসলমান সমাজের প্রকৃত দাবী কী হওয়া উচিত সে সম্বন্ধে যথার্থ বোধ তাঁদেরও ছিল না। তাঁরাও নিচুতলার মুসলমান অর্থ্যাৎ বাঙালী মুসলমান সম্বন্ধে চিন্তা করার কোনো অবকাশই পাননি। শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং সংস্কার বলতে তাঁদের মনে প্রভুত্ব হারান উঁচু কোটির মুসলমানদের কথাই জাগরুক ছিল।

স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে বাংলা ভাষাকে আশ্রয় করে যে অধিকারচেতনা অপেক্ষাকৃত পরে জাগ্রত হয়, আসলে তা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর হিন্দু মধ্যবিত্তের আন্দোলন ও অগ্রগতির সম্প্রসারণ মাত্র। তাঁদেরকে তা করতে গিয়ে দু'ধরণের বাধার সম্মুখীন হতে হয়। লেখাপড়া, শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থ-স্বার্থের দিক দিয়ে অনেকদুর অগ্রসর হিন্দু সমাজের সঙ্গে তাঁদের প্রতিদ্বন্দিতা করতে হত এবং অন্যদিকে উঁচু তলার মুসলমানদের মূল্যচেতনা এবং জীবনদৃষ্টিকে স্বীকার করে নেয়া ছাড়া তাঁদের গত্যন্তর ছিল না। এ দু-মুখী প্রতিবন্ধকতাকে অগ্রাহ্য করতে হলে যে শক্ত সামাজিক ভিত্তিভূমির প্রয়োজন ছিল, তাঁদের পেছনে তা ছিল না। তাই বাঙালী মুসলমানদের জীবনদৃষ্টির সঙ্গে তাঁরা নিজেদের সংযুক্ত করতেন। স্যার সৈয়দ আহমদের আলীগড় আন্দোলন থেকে শুরু করে জামালুদ্দীন আফগানীর 'প্যান ইসলামিজম' পর্যন্ত পশ্চিম দিক থেকে আসা সমস্ত আন্দোলন-প্রবর্তনার সঙ্গে নিজেদের অংশীদার করে নিতেন। কিন্তু স্যার সৈয়দের আলীগড় আন্দোলন একান্তভাবে উত্তর প্রদেশের মুসলমানদের সংখ্যালঘিষ্ট মুসলমান সামন্তশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল। আবার এই সামন্তশ্রেণীর সঙ্গে জনগণের শ্রেণীগত তফাত ছাড়া ভাষা-সাংস্কৃতিক পার্থক্য যে ছিল না একথা বিংশ শতাব্দীতেও ইংরেজী-শিক্ষিত মুসলমানেরা খুব কমই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাঁরা বাঙালী মুসলমানের মধ্যে অনুরূপ সমাজচেতনা এবং মূল্যবোধ সঞ্চারের চেষ্টা করতেন। কিন্তু তা বাঙালী জনগণের সঙ্গে এতটা সম্পর্ক বিরহিত ছিল যে ভাবাদর্শিক কোনো জাগরণ আনতেই পারেনি। ধর্মীয় বদ্ধমত এবং সংস্কারকে আঘাত করে এমন কোনো সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন মুসলমান সমাজের ভেতর থেকে জেগে উঠতে পারেনি। মুসলমানদের দ্বারা সংগঠিত প্রায় সমস্ত সামাজিক কর্মকান্ড এই ধর্মীয় পুনর্জাগরণভিত্তিক।

হিন্দু সমাজে যে ধর্মীয় পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন হয়নি একথা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তাঁদের মধ্যে অন্তত কিছুসংখ্যক মানুষ মৌলিক চিন্তা করেছিলেন, এবং সামাজিক অনেকগুলো বদ্ধমতকে শাণিত আক্রমণ করেছিলেন; বাস্তবে না হলেও তত্ত্বগত দিক দিয়ে বেশ কিছুদূর যুক্তিবাদিতার চর্চা তাঁদের মধ্যে হয়েছে। তাঁদের কৃত আন্দোলনসমূহ যে সমুদ্র তরঙ্গের শীর্ষে ফসফরাসের মতো জ্বলেছে, সমাজে গভীরে প্রবিষ্ট হতে পারেনি, তার নিশ্চয়ই কারণ রয়েছে। কিন্তু মুসলমান সমাজে যুক্তিবাদিতার চাষ একেবারে হয়নি। মৌলিক চিন্তা-ভাবনা করেছেন, এমন মানুষ মুসলমান সমাজে খুব বেশি জন্মাতে পারেনি। নতুন যুগের আলোকে জগত এবং জীবনকে ব্যাখ্যা করে সমাজের সামনে তুলে ধরেছেন এমন মানুষ সত্যিই বিরল। মুসলমান সমাজে যে কোনো মনীষী জন্মাতে পারেননি তার কারণ সামাজিক লক্ষ্যের দ্বি কিংবা ত্রি-মুখীনতা। সামাজিক এবং ধর্মীয় সংগঠনসমূহের মধ্যেই বিভিন্নমুখী লক্ষ্যের কারণসমূহ সংগুপ্ত ছিল।


বাঙালী মুসলমান বলতে যাঁদের বোঝায় তাঁরা মাত্র দুটি আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিলেন এবং অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার একটি তিতুমীরের অনুসারীদের দ্বারা পরিচালিত ওহাবী আন্দোলন। অন্যটি হাজী দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন। এই দুটি আন্দোলনেই বাঙালী মুসলমানেরা মনেপ্রাণে অংশগ্রহণ করেছেন। কিন্তু উঁচু শ্রেণীর মুসলমানেরা এই আন্দোলন সমর্থন করেছেন তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। আসলেও কৃষক জনগণই ছিলেন এই আন্দোলন দুটির হোতা। আধুনিক কোনো রাষ্ট্র কিংবা সমাজদর্শন এই আন্দোলন দুটিকে চালনা করেনি। ধর্মই ছিল একমাত্র চালিকা শক্তি। সে সময়ে বাঙলা দেশে আধুনিক রাষ্ট্র এবং সমাজ সম্পর্কিত বোধের উন্মেষ ঘটেনি বললেই চলে। সমাজের নীচুতলার কৃষক জনগণকে সংগঠিত করার জন্য ধর্মই ছিল একমাত্র কার্যকর শক্তি। রাজনৈতিক দিক দিয়ে এই আন্দোলন দুটির ভূমিকা প্রগতিশীল ছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু সামাজিক দিক দিয়ে পশ্চাদগামী ছিল, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই।

এই আন্দোলন দুটি ছাড়া, অন্য প্রায় সমস্ত আন্দোলন হয়তো ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কিংবা হিন্দু সমাজের উদ্যোগ এবং কর্মপ্রয়াসের সম্প্রসারণ হিসেবে মুসলমান সমাজে ব্যাপ্তিলাভ করেছে। সমাজের মৌল ধারাটিকে কোনো কিছুই প্রভাবিত করেনি। তার ফলে প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম কৃষিভিত্তিক কৌমসমাজের মনটিতে একটু রংটং লাগলেও কোনো রূপান্তর বা পরিবর্তন হয়নি। মধ্যিখানে কয়েকটি শতাব্দীর পরিবর্তন কোনো ভাবান্তর আনতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীতেও এই মনের বিশেষ হেরফের ঘটেনি। বাঙালী মুসলমানের রচিত কাব্য-সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞান পর্যালোচনা করলেই এ সত্যটি ধরা পড়বে। কোনো বিষয়েই তাঁরা উল্লেখ্য কোনো মৌলিক অবদান রাখতে পারেননি। সত্য বটে, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্‌দীন প্রমুখ কবি কাব্যের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। একটু তলিয়ে দেখলেই ধরা পড়বে, উভয়েরই রচনায় চিন্তার চাইতে আবেগের অংশ অধিক। তাছাড়া এই দুই কবির প্রথম পৃষ্ঠপোষক ও গুণগ্রাহী ছিল হিন্দু সমাজ, মুসলমান সমাজ নয়।

মুসলমান সাহিত্যকদের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হয়তো চর্বিতচর্বণ, নয়তো ধর্মীয় পুনর্জাগরণ। এর বাইরে চিন্তা, যুক্তি এবং মনীষার সাহায্যে সামাজিক ডগ্‌মা বা বদ্ধতাসমূহের অসারতা প্রমাণ করেছেন তেমন লেখক-কবি মুসলমান সমাজে আসেননি। বাঙালী মুসলমান সমাজ স্বাধীন চিন্তাকেই সবচেয়ে ভয় করে। তার মনের আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে। ভাসাভাসা ভাবে আনেককিছুই জানার ভান করে আসলে তার জানাশোনার পরিধি খুবই সঙ্কুচিত। বাঙালী মুসলমানের মন এখনো একেবারে অপরিণত, সবচেয়ে মজার কথা এ-কথাটা ভুলে থাকার জন্যই সে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে কসুর করে না। যেহেতু আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশলাভ করছে এবং তার একাংশ সুফলগুলোও ভোগ করছে, ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এঁচড়েপাকা শিশুর মতো। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোন কিছুকেই চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপনার করতে জানে না। যখনই কোনো ব্যবস্থার মধ্যে কোনরকম অসংগতি দেখা দেয়, গোঁজামিল দিয়েই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায় এবং এই গোঁজামিল দিতে পারাটাকেই রীতিমতো প্রতিভাবানের কর্ম বলে মনে করে। শিশুর মতো যা কিছু হাতের কাছে, চোখের সামনে আসে, তাই নিয়েই সে সন্তুষ্ট। দূরদর্শিতা তার একেবারেই নেই, কেননা একমাত্র চিন্তাশীল মনই আগামীকাল কী ঘটবে সে বিষয়ে চিন্তা করতে জানে। বাঙালী মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতেই জানে না এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি-কালচার বলে পরিচিত করতে কুন্ঠিত হয় না।

বাঙালী মুসলমানের সামাজিক কৃষ্টি, সাংস্কৃতিক সৃষ্টি, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিসমূহের প্রতি চোখ বুলোলেই তা প্রতিভাত হয়ে উঠবে। সাবালক মন থেকেই উন্নত স্তরের সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের উদ্ভব এবং বিকাশ সম্ভব। এই সকল ক্ষেত্রে তার সাবালকত্বের কোনো পরিচয় রাখতে পারেনি। যে জাতি উন্নত বিজ্ঞান, দর্শন এবং সংস্কৃতির স্রষ্টা হতে পারে না, অথবা সেগুলোকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারে না, তাকে দিয়ে উন্নত রাষ্ট্র সৃষ্টিও সম্ভব নয়। যে নিজের বিষয় নিজে চিন্তা করতে জানে না, নিজের ভালোমন্দ নিরূপণ করতে অক্ষম, অপরের পরামর্শ এবং শোনা কথায় যার সমস্ত কাজ-কারবার চলে, তাকে খোলা থেকে আগুনে কিংবা আগুন থেকে খোলায়, এইভাবে পর্যায়ক্রমে লাফ দিতেই হয়। সুবিধার কথা হলো নিজের পঙ্গুত্বের জন্য সব সময়েই দায়ী করবার মতো কাউকে না কাউকে পেয়ে যায়। কিন্তু নিজের আসল দুর্বলতার উৎসটির দিকে একবারও দৃষ্টিপাত করে না।

বাঙালী মুসলমানের মন যে এখনো আদিম অবস্থায়, তা বাঙালী হওয়ার জন্যও নয় এবং মুসলমান হওয়ার জন্যও নয়। সুদীর্ঘকালব্যাপী একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুণ তার মনের ওপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত হয়ে রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারে না। তাই এক পা যদি এগিয়ে আসে, তিন পা পিছিয়ে যেতে হয়। মানসিক ভীতিই এই সমাজকে চালিয়ে থাকে। দু'বছরে কিংবা চার বছরে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটানো যাবে না, কিন্তু বাঙালী মুসলমামের মনের ধরণ-ধারণ এবং প্রবণতাগুলো নির্মোহভাবে জানার চেষ্টা করলে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একটা পথ হয়তো পাওয়াও যেতে পারে।

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১২

ভালোবাসা এবং প্রেম!

বাংলা ভাষায় ভালোবাসা এবং প্রেম শব্দ দুইটা আমার কাছে অনেকটাই কনফিউজিং। ভাবি, ভালোবাসা আর প্রেম কি এক জিনিস নাকি ভিন্ন কিছু? ভালোবাসা ছাড়া প্রেম হয় না কিন্তু প্রেম না হলেও ভালোবাসা হতে পারে; এমনটা আমার মনে হয়। তাইলে তো প্রেমের পর্যায়টা চুরান্ত, ভালোবাসার ব্যাপারটা কারণ, আর প্রেমটা ফল। আবার আরেকটা শব্দ আছে ভালো লাগা। একটা গানও বোধ হয় আছে বাংলায়, ভালোলাগা ভালোবাসা এক নয়। কি জানি!!



কোরিয়াতে কেউ কাউকে পছন্দ করলে, I like you বা I like him/her বলে না। এরা like শব্দটা দিয়ে love বুঝে। তাই I like you বা I like him/her বাক্যের ব্যাবহার কেবল ছেলে মেয়েদের মধ্যেই হয়। কিন্তু ভালোবাসা অর্থে love শব্দের ব্যাবহার তো ব্যাপক। তাইলে ভালোবাসি বললেই কি সেটা প্রেম হয়ে যায়? ভালোবাসা আর প্রেম এর মধ্যে আসলে তফাত বা মিলটা কি? আমি কোন মেয়েকে খুব ভালোবাসি বা কোন মেয়ে আমাকে খুব ভালোবাসে এই কথা দ্বারা কি আমি ঐ মেয়ের সাথে প্রেম করি বা ঐ মেয়ে আমার সাথে প্রেম করে কিংবা আমাদের মধ্যে প্রেম হয়েছে, বা প্রেম আছে বুঝায়? কি জানি!!!





আসলে আমাদের বাঙ্গালী সমাজে ভালোবাসা শব্দটি এমনিতে নিরাপদ কিন্তু প্যাচগী লেগে যায় যখন সেটা কোন ছেলে মেয়ের মধ্যে হয়। তখনই খুলে না বলা পর্যন্ত সেটা প্রেম আর ভালোবাসার মধ্যে দুদুল্যমান থাকে।অনেক ভুল বুঝা বুঝিও হয়। কি জানি!!!

বুধবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১২

মোবাইলফোনের অপব্যবহার ও আলোকিত সমাজের প্রত্যাশা

প্রযুক্তি তো জীবনকে সহজ করার জন্য, সুন্দর করার জন্য। অবশ্য এর জন্য প্রয়োজন হয় সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার হতে পারে, আবার হতে পারে অপব্যবহারও। আজকাল অবশ্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তির অপব্যবহার চোখে পড়ার মতো। এ প্রসঙ্গে মোবাইলফোনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মোবাইলফোন এখন খুবই জনপ্রিয় একটি প্রযুক্তি। প্রতিদিনই এর গ্রাহক বাড়ছে। তবে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এর চাহিদা বেশি। এদের অনেকেই একাধিক ফোন ও সিম ব্যবহার করে থাকে।
মোবাইলফোনের কোম্পানিগুলো তরুণ-তরুণীদের আকৃষ্ট করার জন্য নানা অফারও দিয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি হলো গভীর রাতের সাশ্রয়ী অফার। রাত জেগে তরুণ-তরুণীরা আসলে ফোনের কতোটা সদ্ব্যবহার করে তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে পত্রপত্রিকায় যেসব রিপোর্ট ও বিশ্লেষণ মুদ্রিত হয়েছে তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, রাতজাগা তরুণ-তরুণীদের দ্বারা মোবাইলফোনের অপব্যবহারই হচ্ছে বেশি। এর প্রভাব পরিবারে পড়ছে, বিরূপ প্রভাব পড়ছে তরুণ-তরুণীদের লেখাপড়া, স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও। মোবাইলফোনের মাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিওচিত্র ধারণ বর্তমান সময়ের আর এক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি খবর গত রোববার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। খবরে বলা হয়, মোবাইলফোনে ৮ম শ্রেণির এক ছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিওচিত্র ধারণ করার অভিযোগে ৩ তরুণকে গ্রেফতার করেছে ৱ্যাব। ৱ্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরে তাদের প্রত্যেককে দু বছর করে কারাদণ্ড দেন। ঢাকার উত্তরার একটি মেসে গত শনিবার এ ঘটনা ঘটে। সাজা পাওয়া ৩ তরুণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
ৱ্যাবসূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দুপুরে পূর্বপরিচিত এক যুবক ৮ম শ্রেণির এক ছাত্রীকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের একটি মেসে নিয়ে যায়। সেখানে পারভেজ সরকার (২০), মাহবুব হাসান (২০) ও উদয় শর্মা (২০) নামের ৩ তরুণ ওই মেয়েটির আপত্তিকর ভিডিওচিত্র মোবাইলফোনে ধারণ করে। এরপর তারা মেয়েটির কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দেয়া না হলে ভিডিওচিত্র ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়া হবে বলেও মেয়েটিকে ভয় দেখানো হয়। মেয়েটি মেস থেকে বেরিয়ে ৱ্যাব-১কে ঘটনাটি জানায়। ঘটনাস্থলে গিয়ে ৱ্যাব ৩ তরুণকে হাতেনাতে আটক করে। আলোচ্য ঘটনা মোবাইলফোন তথা প্রযুক্তির অপব্যবহারের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ। আর কোনো অশিক্ষিত মানুষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্ররা ওই ঘটনার সাথে জড়িত। পরিচিত একজন ছাত্র কেমন করে এক ছাত্রীকে ফাঁদে ফেলে এভাবে আপত্তিকর ছবি তুলে ব্লাকমেইল করে? বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছার এ দীর্ঘ সময়ে ওই ছাত্ররা শিক্ষার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কিংবা নৈতিকতার কোনো পাঠই কী পায়নি কিংবা গ্রহণ করেনি? যদি না পেয়ে থাকে তাহলে এমন শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে জাতির কী লাভ? শুধু ছাত্রদের নয়, মেয়েটির রুচিবোধ, নীতিবোধ নিয়েও প্রশ্ন জাগে। কোন সাহসে মেয়েটি একাকি এক ছাত্রের আহ্বানে ছাত্রদের মেসে গিয়ে হাজির হয়।
প্রেমের নামে, নারী স্বাধীনতার নামে এমন অনাচার সমাজে কী করে চলে? এমন শিক্ষা ও সংস্কৃতি দিয়ে কী আলোকিত সমাজ গড়া সম্ভব? আর মোবাইলফোনের ব্যবহার ও অপব্যবহার নিয়ে সরকার, সমাজ ও পরিবারের বোধ হয় নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এরা ভাবলে মোবাইলফোন কোম্পানিগুলোও হয়তো তাদের প্রচার-প্রোপাগান্ডায় নৈতিক মানদণ্ড নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে। তাদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।

 
 লেখক ,
 রেজা জোয়ারদার    ( সংগৃহীত )











মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১২

সম্পর্কের দুটি দিকঃ প্রেম এবং বন্ধুত্ব

মানুষের জীবনে প্রেম না বন্ধুত্ব, কোনটা বেশি জরুরী? যদি বলি প্রেম, তাহলে বন্ধুত্ব? সেও কি ফেলনা?
কিন্তু বন্ধুত্ব সম্পর্ক থেকে যে প্রেম সম্পর্কের সৃষ্টি, সেও কি সত্যি প্রেমের মতো মধুর? বন্ধুত্বের সম্পর্ক থেকে প্রেমের সম্পর্কে আসা যায়,
কিন্তু প্রেম থেকে বন্ধুত্বে কি সত্যি যাওয়া যায়?
মানুষের সম্পর্ক কি এতোই ঠুনকো যে চাইলেই সাড়ে ৩ ঘন্টার ছবির মতো কাট/cut আর এডিট/edit করা যায়?
বন্ধুত্ব যদি আজীবন লালন করা যায়, তাহলে প্রেম কেন নয়? বিয়ের পর নাকি প্রেম ফিকে হয়ে আসে। কথায় আছে, "বড় প্রেম শুধু কাছেই টানেনা, দূরেও ঠেলে দেয়" ।
আর বন্ধুত্ব? সেও কি আমরা সময়ের প্রয়োজনে বদলে ফেলিনা?
বন্ধুত্ব এর সম্পর্ক কেও এখন কত ভাষায়
সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
সময়ের প্রয়োজনে আমরা কি বন্ধুত্বের সম্পর্ক কেও হারিয়ে ফেলছিনা? সত্যিই কি আমরা
বন্ধুত্বের জন্য সব ত্যাগ করতে পারি?
আর প্রেম? সেই প্রেম?
যাকে এক জীবনে পাওয়া হোল না বলে এখন আর বৃথা মনে হয় না জীবন টাকে!!!
সময়ের প্রয়োজনে আমরা আবেগ হারাতে বসেছি। সত্যি কি এখন আবেগী হয়ে স্পর্শ করে প্রেম বা
সত্যিকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক??



(Collected )

শেষ লেখা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সমুখে শান্তিপারাবার ,
ভাসাও তরণী হে কর্ণধার ।
তুমি হবে চিরসাথি ,
লও লও হে ক্রোড় পাতি ,
অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি
ধ্রুবতারকার।
 
মুক্তিদাতা , তোমার ক্ষমা , তোমার দয়া
হবে চিরপাথেয় চিরযাত্রার ।
 
হয় যেন মর্ত্যের বন্ধন ক্ষয় ,
বিরাট বিশ্ব বাহু মেলি লয় ,
পায় অন্তরে নির্ভয় পরিচয়
মহা-অজানার ।

বন্ধুত্ব ও ভালবাসা

 বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় অনেক তফাৎ আছে, কিন্তু ঝট্‌ করিয়া সে তফাৎ ধরা যায় না।  বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালোবাসা পোশাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হইলেও হানি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল। কিন্তু ভালোবাসার পোশাক একটু ছেঁড়া থাকিবে না, ময়লা হইবে না, পরিপাটি হইবে। বন্ধুত্ব নাড়াচাড়া টানাছেঁড়া তোলাপাড়া সয়, কিন্তু ভালোবাসা তাহা সয় না। আমাদের ভালোবাসার পাত্র হীন প্রমোদে লিপ্ত হইলে আমাদের প্রাণে বাজে, কিন্তু বন্ধুর সম্বন্ধে তাহা খাটে না; এমন-কি, আমরা যখন বিলাসপ্রমোদে মত্ত হইয়াছি তখন আমরা চাই যে, আমাদের বন্ধুও তাহাতে যোগ দিক! প্রেমের পাত্র আমাদের সৌন্দর্যের আদর্শ হইয়া থাক্‌ এই আমাদের ইচ্ছা— আর, বন্ধু আমাদেরই মত দোষে গুণে জড়িত মর্ত্যের মানুষ হইয়া থাক্‌ এই আমাদের আবশ্যক। আমাদের ডান হাতে বাম হাতে বন্ধুত্ব। আমরা বন্ধুর নিকট হইতে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সাহায্য চাই ও সেই জন্যই বন্ধুকে চাই। কিন্তু ভালোবাসার স্থলে আমরা সর্বপ্রথমে ভালোবাসার পাত্রকেই চাই ও তাহাকে সর্বতোভাবে পাইতে চাই বলিয়াই তাহার নিকট হইতে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সঙ্গ চাই। কিছুই না পাই যদি, তবুও তাহাকে ভালোবাসি। ভালোবাসায় তাহাকেই আমি চাই, বন্ধুত্বে তাহার কিয়দংশ চাই। বন্ধুত্ব বলি তে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগৎ নাই। দুই জনেই দুই জনের জগৎ। অতএব বন্ধুত্ব অর্থে দুই এবং তিন, প্রেম অর্থে এক এবং দুই।  অনেকে বলিয়া থাকেন বন্ধুত্ব ক্রমশ পরিবর্তিত হইয়া ভালোবাসায় উপনীত হইতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা নামিয়া অবশেষে বন্ধুত্বে আসিয়া ঠেকিতে পারে না। একবার যাহাকে ভালোবাসিয়াছি , হয় তাহাকে ভালোবাসিব নয় ভালোবাসিব না; কিন্তু একবার যাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব হইয়াছে, ক্রমে তাহার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপিত হইতে আটক নাই। অর্থাৎ বন্ধুত্বের উঠিবার নামিবার স্থান আছে। কারণ, সে সমস্ত স্থান আটক করিয়া থাকে না। কিন্তু ভালোবাসার উন্নতি অবনতির স্থান নাই। যখন সে থাকে তখন সে সমস্ত স্থান জুড়িয়া থাকে, নয় সে থাকে না। যখন সে দেখে তাহার অধিকার হ্রাস হইয়া আসিতেছে তখন সে বন্ধুত্বের ক্ষুদ্র স্থানটুকু অধিকার করিয়া থাকিতে চায় না। যে রাজা ছিল সে ফকির হইতে রাজি আছে, কিন্তু করদ জায়গীরদার হইয়া থাকিবে কিরূপে? হয় রাজত্ব নয় ফকিরী, ইহার মধ্যে তাহার দাঁড়াইবার স্থান নাই। ইহা ছাড়া আর একটা কথা আছে— প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )


সোমবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১২

সঠিক জীবনদৃষ্টি

মস্তিষ্করূপী বিস্ময়কর জৈব কম্পিউটার যথাযথভাবে ব্যবহার করার জন্যে প্রয়োজন সুসংহত মানসিক প্রস্তুতি। আর মানসিক প্রস্তুতির ভিত্তি হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি, নিয়ত বা অভিপ্রায়। কারণ মন পরিচালিত হয় দৃষ্টিভঙ্গি বা নিয়ত দ্বারা। আর মস্তিষ্ককে চালায় মন। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণা করেছেন মন ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে। ডা. এলেন গোল্ডস্টেইন, ডা. জন মটিল, ডা. ওয়াইল্ডার পেনফিল্ড ও ডা. ই রয় জন দীর্ঘ গবেষণার পর বলেছেন, একজন প্রোগ্রামার যেভাবে কম্পিউটারকে পরিচালিত করে, তেমনি মন মস্তিষ্ককে পরিচালিত করে। মস্তিষ্ক হচ্ছে হার্ডওয়ার আর মন হচ্ছে সফটওয়ার। নতুন তথ্য ও নতুন বিশ্বাস মস্তিষ্কের নিউরোনে নতুন ডেনড্রাইট সৃষ্টি করে। নতুন সিন্যাপসের মাধমে তৈরি হয় সংযোগের নতুন রাস্তা। বদলে যায় মস্তিষ্কের কর্ম প্রবাহের প্যাটার্ন। মস্তিষ্ক তখন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে নতুন বাস্তবতা উপহার দেয়। নতুন বাস্তবতা ভালো হবে না খারাপ হবে, কল্যাণকর হবে না ক্ষতিকর তা নির্ভর করে মস্তিষ্কে দেয়া তথ্য বা প্রোগ্রাম-এর ভালো-মন্দের ওপর। কল্যাণকর তথ্য ও বিশ্বাস কল্যাণকর বাস্তবতা সৃষ্টি করে আর ক্ষতিকর তথ্য বা বিশ্বাস ক্ষতিকর বাস্তবতা উপহার দেয়। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, জীবনের নতুন বাস্তবতার চাবিকাঠি হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি বা নিয়ত।

জীবনদৃষ্টি বা দৃষ্টিভঙ্গি কথার অর্থ হচ্ছে জীবনকে আমি কীভাবে দেখছি। জীবন সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি কী বা জীবন সম্পর্কে আমার সিদ্ধান্ত কেমন হওয়া উচিত- এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট অভিমত। আর জীবনকে সুন্দর করার জন্যে যে একটি জিনিসেরই প্রয়োজন, তাহলো সঠিক জীবনদৃষ্টি। বাকি সবকিছু তখন এমনিই চলে আসে। কারণ চাবিটা যদি ঠিক থাকে আপনি তালাটা খুলতে পারবেন। তা নাহলে যত চাবি থাকুক আপনার কাছে, এটা যদি ঐ তালার চাবি না হয়, তাহলে সেই তালা খোলা যাবে না। জীবনের তালা, জীবনের বদ্ধ দরজা খোলার জন্যে যে সঠিক চাবি দরকার সেই চাবিটি অর্জন করার জন্যে প্রয়োজন সঠিক জীবনদৃষ্টি।

বিজ্ঞানীরা বলেন দৃষ্টিভঙ্গি দুধরনের। এক. প্রো-একটিভ। দুই. রি-একটিভ। প্রো-একটিভ অর্থ হচ্ছে যে কোনো পরিস্থিতিতে উত্তেজিত বা আবেগপ্রবণ না হয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত ও প্রদক্ষেপ গ্রহণ। প্রো-একটিভ অর্থ হচ্ছে অন্যের কাজের প্রতিক্রিয়া হিসেবে কোনো কাজ বা আচরণ না করা। সর্বাবস্থায় নিজের লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে আচরণ ও কর্মপন্থা করা। প্রো-একটিভ অর্থ হচ্ছে কী কী নেই তা নিয়ে হা-হুতাশ না করে যা আছে তা নিয়েই সুপরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু করা। প্রো-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় সাফল্য ও বিজয় ছিনিয়ে আনে।

অপরদিকে রি-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় ব্যর্থতা, হতাশা ও অশান্তি সৃষ্টি করে। রি-একটিভ হলে নিয়ন্ত্রণ তখন নিজের হাতে থাকে না। নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অন্যের হাতে। আপনি যখন অন্যের কথায় কষ্ট পান, অন্যের কথায় রেগে যান, অন্যের আচরণে ক্রোধে ফেটে পড়েন, অন্যের তোষামোদিতে উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন, অন্যের চাটুকারিতায় গলে যান, অন্যের কথায় নাচেন, তখন নিয়ন্ত্রণ আর আপনার হাতে থাকে না। নিয়ন্ত্রণ চলে যায় অন্যের হাতে।

একজন প্রো-একটিভ মানুষের বৈশিষ্ট্য ৩টি :

১. তারা উত্তেজিত বা আবেগপ্রবণ না হয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত ও প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

২. তারা কী কী নেই তা নিয়ে হা হুতাশ না করে যা আছে তা নিয়েই সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করেন।

৩. তারা সাময়িক ব্যর্থতায় ভেঙে পড়েন না

রবিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১২

মনের গহিনে










মনের গহীনে চোখ রাখলে দেখি এক অন্ধকার গলিপথ। কেউ নেই, যেন অন্য পৃথিবী। ওই অন্ধকার রাস্তা দেখলে কেমন যেন ভয় করে উঠে। নিজেকেই জিজ্ঞেস করি তবে এই অন্ধকার পথ ধারন করে থাকা হয় কিভাবে? তাইতো কিভাবে আছি এতকাল!! আসলে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, আমার পথে হাটে না কেউ বহুকাল। তাই পথ চিনিনা। আজও কি চিনি? আমি একাকি অনেক দিন, অন্তরাত্মার সাথে সন্ধি করে চলেছি, খুজেছি কিন্তু পাইনি আমার পথ। তবুও আমার আকাশে মেঘ জমে ব্যাকুল হয়ে বৃষ্টি ঝরে কখনও। আমিও সুড়ঙ্গের শেষে আলোকিত মুখ খুজি। যেখানে সাগরের বিশালতা আর্দ্র বায়ুতে খেলা করে। আমি ভিজে বালিতে স্নান করি। অথবা বুদ্ধদেব বসুর, ঠুঠার মত নাঙ্গা বাইগিনের খোজ করি। গভীর অরন্যে খুজব সেই অরণ্য দেবীকে। বনের বুনো গন্ধের ঘোর নেশায় নিজেকে হারাই।

কখনও বড় ইচ্ছে করে আটপৌরে আমার এই মনের, জানালার পাশে বাদলও ধারা ঝরছে আর আমি রবীন্দ্রনাথের কোন গভীর চরিত্র হয়ে মনঝড়ে ভিজে চলেছি। অযুত নিযুত গান লিখবে কবি আমাকে নিয়ে। বড় বেশী চাওয়া! না হয় একটা নীল মেঘের গানই হোক। বুকের ভিতর কি থাকে, কেন না পাওয়ার ব্যাথাটা এত তীব্র। নীল অপরাজিতার মত কেবলই নীল হই। রাত শেষের কুয়াসার অন্তরালে অতৃপ্ত আত্মার মত ঘুরছি। আমি মাছরাঙ্গা হই, আমার নরম নীল পালকে কোমল রোদ্দুর ছুয়ে যায়। আমি গাছের ফাক দিয়ে আসা সূর্য রশ্মি হয়ে যাই, মুছিয়ে দেই শিশির সবুজ পল্লবের গা থেকে।

বাতাসে কোথাও ফিসফিসিয়ে কথা হয় "এস জল হই সবুজ পাতায় গড়িয়ে পড়ি, মৃত্তিকায় মিশি উদ্ভিদ শুষে নিবে, তারপর শিরা উপশিরা বেয়ে পাতা হয়ে বেরিয়ে যাব হাওয়ায়।" শিরশিরে ইচ্ছে জাগে, আনন্দ হই, অধরা রহস্য হই, বেদনার্ত মনের নীলকে হলুদ আলোতে মিশিয়ে ভালোবাসার বেগুনি হই।


( সংগৃহীত )

বন্ধুত্ব কাকে বলে ? উহা কত প্রকার, কি কি ? বর্ননা দাও ।




বন্ধুত্ব হল এমন একটা বন্ধন, যা মানুষকে যেমন কাছে টানে তেমনি দূরেও ঠেলে দেয়। এর টান এমন শক্তিশালী যে বন্ধুর প্রয়োজনে নিজের সবচেয়ে দামি প্রাণটাও দেওয়া যায়। আবার অন্যকে বন্ধুর অমোঘ টানে আটকে রেখে খুব সুন্দর কায়দায় প্রতারনা করে নিজের উদ্দ্যেশ্য হাসিল করা যায় এমনকি তার সস্তা প্রাণটাও নেওয়া যায়।

বন্ধু এর শাব্দিক বিশ্লেষনঃ
ব - বুকের সবচেয়ে কাছে।
ন - নিজের একান্ত আপন।
ধু - ধ্ুঁয়ার মত রহস্যময়।
তাহলে কি দাড়ালো, বন্ধু এমন আর্কষনীয় এক জিনিস যা খুবই রহস্যময়। আর মানুষের একটা অতি পুরাতন বদাভ্যাস হল রহস্যের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে তার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

বন্ধু বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। আমার দৃষ্টিকোন থেকে দুই প্রকার। যেমন , ১. আত্মার প্রয়োজনে, ২. পরিবেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের প্রয়োজনে।

১। আত্মার প্রয়োজনে ঃ একজনের সাথে অন্যের আত্মার টানে তৈরি হয় বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্ব সৃষ্টির প্রকৃয়া প্রাকৃতিক। এ ধরনের বন্ধুত্বে প্রতারনা খুব কমই হয়। তবে হয় না এমন নয়। এ ধরনের বন্ধু প্রায়ই ক্ষেত্রে বাল্যবন্ধূ হয়। আমার নিজের বন্ধু, যার সাথে আমার দীর্ঘ ২১ বছরের পরিচয় । সে বন্ধুই তার নিজের স্বার্থে আমার প্রতারনা করেছিল। একাধিক বার তাকে আমি ক্ষমা করেছি কিন্তু অবশেষে তাকে নিজের থেকে দূরে ঠেলে রাখতে বাধ্য হয়েছি। তাকে এ্যাভয়েড করে থাকতে আমার যে কি কষ্ট হয় তা শুধূ আমি নিজেই জানি , অন্যকে বোঝানোর সাধ্য আমার নেই। একটা কথা আছে, যার আছে সে বোঝে না আর যার নেই সে বোঝে তার কত পোড়ে।
২। পরিবেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের প্রয়োজনে ঃ বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ বিভিন্ন মানুষের সাথে পরিচয় হয়। একসাথে কাজ করে। এই কাজ করার ফাঁকে কারো সাথে হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বন্ধুতে পরিণত হয়। বিভিন্ন বয়সে এ বন্ধুত্ব হয়। এ বন্ধুত্ব কখনও কাজের প্রয়োজনে, স্বার্থের প্রয়োজনে অথবা একাকিত্বের যন্ত্রনা গোছানোর জন্য হয়ে থাকে। এ বন্ধুত্ব কখনও প্রতারনারও হয়ে থাকে যেমন আমার জীবনে একাধিক বার হয়েছে।

অতএব আসুন সকলে বন্ধুর বন্ধনে আবদ্ধ হই, নি-স্বার্থে, শুধু মাত্র সময় কাটানের জন্য , একাকিত্ব কাটানোর জন্য, ভালো পরামর্শের জন্য।


 ( সংগৃহীত )

" কিছু কথা বলার ভাষা থাকেনা ........."

জীবনের গতিশীল ধারার একজন অংশীদার হয়ে পথ চলেছি কিছু হাতকে সাথে নিয়ে কিছু আমার মতো মানুষের পাশা-পাশি পথ চলে, দোটানার পথ গুলো পাড়ি দিতে অনেক দ্বিধা পাড় হতে হয়, অনেক সংশয় তবু থেকে যায়। বোঝাগুলো যখন ক্রমশ আরো আরো বেশি বোঝায় পরিনত হয়ে ঘাড়ের উপর চেপে বসে তখন হাতগুলো বুকে এসে সান্ত্বনা জানায়, আশ্বস্ত করে এই বলে যে " আমরা তো আছিই!" অব্যক্ত কথাগুলো তখন বলে চলি ক্রমশ... এভাবেই চলার পথের সাথি হয়ে 'বন্ধু' নামের এই মানুষগুলোর কাছে নিজের আশ্রয়ে নির্দ্বিধায় সংশয়গুলোকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিতে পারি অনায়াশে।

'সুখ', 'যন্ত্রনা','আবেগের' কোন সংজ্ঞা আমরা জানি না, তবু এদের উত্থান পতনে আমরা আন্দোলিত হই, তারপর আমরা মিলিয়ে নিই যন্ত্রনা আর আবেগগুলোকে অবশেষে আমরা অনুভব করি আমরা সবাই মিলে সুখি! আমাদের হাতগুলো আমরা আরো প্রসারিত করি, অবশেষে আমি-তুমি মিলে অখন্ড 'আমরা' হই। 'দুঃখ' শব্দের একটি প্রতিশব্দ খুঁজতে গিয়ে দুঃখকেই হারিয়ে ফেলি আর আবিস্কার করি আমরা বন্ধু! কারন আমরা জানি, 'বন্ধু' এই শব্দটির কোন প্রতিশব্দ নেই।

কষ্টকে চেপে রাখতে, কিছু স্পর্শকাতর যন্ত্রনাকে এড়িয়ে যেতে না পেরে, কখনো বা অভিনয়ের আশ্রিত হয়ে, একে অপরকে বুঝাতে চাই "দেখো, আমি কত সুখি, আমার কিছু হয়নি! তুমি আমাকে নিয়ে ভেবোনা, আমার জন্য মন খারাপ করোনা" তখন বন্ধুটির সেই অভিনয়-আশ্রিত কষ্টকেই স্পষ্ট দেখতে পাই চোখের সামনে, সেই চেপে রাখা যন্ত্রনাটিই বুকে এসে বারেবার বিঁধে, আর বন্ধুর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলি " যদি সুখিই হবি ,তবে তোর বুকে ওটা কিসের ছুরি?" আমরা একে অপরের অদৃশ্য আবেগকে স্পষ্ট দেখতে পাই, আর অনুভব করি। স্পষ্ট ভাষায় তখন জানিয়ে দেই " যা লুকোতে পারবি না, তা লুকোতে যাস কেন?" অভিনয় আশ্রিত বন্ধুটি তখন বোকার হাসি হাসে, মুখে নয়, মনে... সেটাও যে স্পষ্ট দেখি! লুকোচুরি তাই বন্ধুত্বের সঙ্গী নয়, কখনো ছিলোও না।

অনেক অনেক ভাগ্যবান ভাবি নিজেকে এই ভেবে যে, হারিয়ে যাবো। হয়তো একদিন পথটি ছুড়ে ফেলে দেবে, ধরে রাখবে এই বন্ধু আর এই সব শান্তি আর ছায়া ছায়া হাত গুলো....

মনের যে কথা গুলো বলতে চাই তা প্রকাশের ভাষা বর্ণমালা ধারন করেনা, সেটা কেবল মন থেকে মনেই প্রবাহিত হয়, তাই কিছু ব্যর্থ চেষ্টা করলাম কিছু কথা প্রকাশের যার প্রায় পুরোটাই অপ্রকাশিত থাকলো...




(সংগৃহীত ).

শনিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১২

ভাল বন্ধু সবার মিলেনা , কারন............

 বন্ধু... কথাটি খুব ছোট্ট হলেও গভীরতা আকাশ সমান বিশাল । জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা একা নই । চলার পখের বন্ধুর রাস্তা গুলো বন্ধু বিনে চলা প্রায় অসম্ভব। তাই শুধু বন্ধু হলেই পুরন হলেই হবেনা বন্ধুত্বের পুর্ন দাবী, হতে হবে বন্ধুর মতো বন্ধু। কথায় আছে Friends Never Die. বন্ধু কখনো মরেনা। আমাদের আমাদের নবী করিম (স:) বলছেন পথে বের হওয়ার আগে আমাদের একজন বন্ধু নিয়ে বের হওয়া উত্তম।
ভালো বন্ধু বন্ধুরা... যেনো তেনো বিষয় নয়.. এমনকি বলা যায় সবার জীবনে ভালো বন্ধু মিলেনা। বা নিজেও করো জন্য হতে পারেনা। ভালো বন্ধু হবার জন্য কিছু ব্যপার লক্ষনিয় :
01. Don't worry about knowing people just make yourself worth knowing.
02. Friends are those rare people who ask how we are and then wait to hear the answer.
03. If you can buy a person's friendship, it is not worth it.
04. True friends have hearts that beat as one.
05. If you cannot think of any nice things to say about your friends, then you have the wrong friends.
06. Make friends before you need them.
07. If you were another person, would you like to be a friend of yours?
08. A good friend is one who neither looks down on you nor keeps up with you.
09. Be friendly with the folks you know if it weren't for them you would be a total stranger.
10. A friend is never known till he is needed.
11. Friendship is a responsibility. ..not an opportunity.
12. Friendship is the cement that holds the world together.
13. Friends are those who speak to you after others don't.
14. The reason a dog has so many friends is that he wags his tail and not his tongue.
15. Pick your friends, but not to pieces.
16. A friend is one who puts his finger on a fault without rubbing it in.
17. The way to have friends is to be willing to lose some arguments.
18. If a friend makes a mistake, don't rub it in... Rub it out.
19. Deal with other's faults as gently as if they were your own.
20. People are judged by the company they keep and the company they keep away from.
21. A friend is a person who can step on your toes without messing up your shine.
22. The best mirror is an old friend.
23. The best possession one may have is a true friend.
24. Make friendship a habit and you will always have friends.
25. You will never have a friend if you must have one without faults.
26. Doing nothing for your friends results in having no friends to do for.
27. Anyone can give advice, but a real friend will lend a helping hand.
28. You can make more friends by being interested in them .
29. A real friend is a person who, when you've made a fool of yourself, lets you forget it.
30. A friend is a person who listens attentively while you say nothing.
31. You can buy friendship with friendship, but never with dollars.
32. True friends are like diamonds, precious but rare; false friends are like autumn leaves, found everywhere.
33. A friend is someone who thinks you're a good egg even though you're slightly cracked.



তানভীর সজীব  ( সংগৃহীত ) 

বুধবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১১

বন্ধু নির্বাচনে ইসলামের নীতিমালা

বন্ধু নির্বাচনে ইসলামের নীতিমালা
মানুষ সামাজিক জীব। এর মানে হলো- মানুষ একা হলেও সে একটি সমাজের অংশ। সমাজ গড়ে ওঠে সমষ্টিকে নিয়ে, একাকি সমাজ গঠিত হয় না। সমাজে বিচিত্র শ্রেণীর লোক বাস করে। একেক জনের পেশা একেক রকম। তাই সমাজে একজনকে আরেকজনের প্রয়োজন পড়ে। এটা আল্লাহর এক অশেষ নিয়ামত। কেননা সমাজবদ্ধতার প্রশ্নে মানুষ একে অপরের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। সঠিকভাবে যথার্থ বন্ধু নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে মানুষ তার সামাজিক এবং ব্যক্তিগত জীবনকে সুষ্ঠু ও নিরাপদ করে তোলে। এই বন্ধুত্বের ব্যাপারে ইসলামের রয়েছে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি।
আপনাদেরও নিশ্চয়ই অনেক বন্ধু আছে এবং তাদের সাথে কথা বলেন, তাদেরকে দেখতে যান, তাদের সাহায্যে এগিয়ে যান এবং তারাও আপনার দুঃসময়ে নিশ্চয়ই আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসে! কারো কারো বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা প্রচুর। আবার অনেকেই কয়েকজন বন্ধু নিয়েই তৃপ্ত, সন্তুষ্ট। অবশ্য এটা স্পষ্ট যে, বন্ধুদের মাঝে অনেকেই আছে খুবই আন্তরিক এবং সুহৃদ,ঘনিষ্ঠ এবং দুর্দিনে সাহায্যের হাত সম্প্রসারণকারী। ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুর মর্যাদা অনেক উপরে। এমনকি মানুষের সৌভাগ্যের ওপরও বন্ধুত্বের প্রভাব পড়ে। এজন্যেই নবী করিম (সা.) এবং তাঁর উত্তর প্রজন্মের ইমামগণ বন্ধু নির্বাচন করার ব্যাপারে মূল্যবান কিছু দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, 'একটি মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের অনুসারী হয়, তাই সবার ভেবে দেখা উচিত কার সাথে বন্ধুত্ব করবে।' অন্যভাবে রাসূলে খোদা (সা.) বন্ধুত্বকে এতো বেশি প্রভাব বিস্তারকারী বলে মনে করেন যে বন্ধুত্ব আপন সহচরকেও নিজের ধর্মে নিজের আকিদা বিশ্বাসের দিকে নিয়ে আসে। তাই সহচরের গুরুত্ব বিশেষ করে উত্তম বন্ধুর গুরুত্ব অপরিসীম।
এ প্রসঙ্গে নবীজী বলেছেনঃ "একাকী নিঃসঙ্গতার চেয়ে ভালো বন্ধু উত্তম আর নিঃসঙ্গতা মন্দ বন্ধুর চেয়ে উত্তম।" তার মানে হলো-ভালো এবং যথার্থ বন্ধু যদি নাও থাকে তাহলেও তা একজন মন্দ ও অযোগ্য বন্ধু থাকার চেয়ে ভালো।
বন্ধু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আগ-পর বিচার বিবেচনা করে নেওয়া উচিত। কারো প্রতি মন আকৃষ্ট হলেই তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে এমনটা ঠিক নয় বরং প্রথমে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে ভালো লাগা বা তার প্রতি আকর্ষণের কারণ কিংবা উৎসটা কী এবং সে আদৌ বন্ধু হবার যোগ্য কি না ইত্যাদি। আমিরুল মুমেনিন হযরত আলী (আ) থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ "যে ব্যক্তি চিন্তাভাবনা করে যথাযথ বিচার বিশ্লেষণ করে বন্ধু নির্বাচন করবে, তাদের বন্ধুত্ব বজায় থাকবে এবং তাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর হবে।" হঠাৎ করে কারো সাথে পরিচিত হবার মধ্য দিয়ে অর্থাৎ কোনোরকম বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে অনেক সময় দুঃখজনক পরিণতি ঘটতে পারে। অনেক ইন্টারনেট বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি খুব সহজেই অনুমান করা যায়। যাই হোক, এই যে আমরা বিচার বিবেচনার কথা বললাম, ইসলাম এ সম্পর্কে কী বলে অর্থাৎ একজন ভালো বন্ধুর গুণাবলী কী ইসলামের দৃষ্টিতে সেদিকে একবার নজর দেওয়া যাক।
ইসলামের দৃষ্টিতে ভালো বন্ধুর অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হলো বিবেক বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়া এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঐ বুদ্ধি বিবেককে কাজে লাগানো। এই বিবেকবান বন্ধু সদুপদেষ্টা হয় এবং তার ওপর সবসময় আস্থা রাখা যায় কেননা এ ধরনের বন্ধু ভুল ত্রুটি থেকে ফিরিয়ে রাখে। বিবেক-বুদ্ধিমান বন্ধুদের সাথে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বহু বর্ণনা রয়েছে। ইমাম আলী (আ) বলেছেন, বিবেকবান বন্ধুর সাহচর্য অন্তরাত্মাকে প্রাণচাঞ্চল্য দান করে। বিবেকবান বন্ধু মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং মানুষকে ত্রুটি বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে। পক্ষান্তরে অজ্ঞ এবং মূর্খ বন্ধু কারো কোনো উপকার তো করেই না বরং তার কথাবার্তা আর আচার আচরণ অন্যদের বিরক্তি আর মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নৈতিক উপযুক্ততা ভালো বন্ধুর অপর একটি গুণ। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী ভালো বন্ধু সেই হতে পারে যে নৈতিক স্খলন থেকে দূরে থাকে। কেননা দুশ্চরিত্রবান আর মন্দ কাজে অভ্যস্ত বন্ধু শেষ পর্যন্ত মানুষকে অবৈধ, অশোভন আর অনৈতিক কাজের দিকে নিয়ে যায়। পবিত্র কোরআনের নূরানী আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, যে বিচ্যুত এবং ফাসেকের সাথে বন্ধুত্ব করে সে আসলে নিজের ওপর নিজেই জুলুম করে। কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থা সম্পর্কে কোরআন বলেছেঃ "হায় আমার দুর্ভাগ্য! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ আসার পর সে আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল। শয়তান মানুষকে বিপদকালে ধোঁকা দেয়।" বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছেঃ "উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে, সে-ই অধম যে চলে তফাতে।" অর্থাৎ যে ভালো, তার কোনো বয় নেই, সে ভালো-মন্দ সবার সাথেই বিনা দ্বিধায় চলতে পারে, কেননা সে খারাপ হবে না, খারাপের মাধ্যমে প্রভাবিত হবে না। তাই যে মন্দের প্রভাবের আশঙ্কায় অধমকে এড়িয়ে চলে, সে নিজেই অধম। কিন্তু মনোবিজ্ঞান এই বক্তব্যের পক্ষে নেই।
কেননা মানুষ কোনো পাথর নয় কিংবা নয় কোনো শুকনো কাঠ বিশেষ। যতোই সে চেষ্টা করুক না কেন অধমের দোষগুলো বা তার চিন্তাদর্শ থেকে অত্যন্ত সতর্কভাবে দূরে থাকতে, পারবে না। যারা সতর্ক থাকার কথা বলে তাদের ঐ বক্তব্য একান্তই ভ্রান্ত একটা দাবিমাত্র। কারণ কারো সাথে বন্ধুত্ব করলে মনের অজান্তেই তার কথাবার্তা, আচার আচরণ, কাজকর্মের প্রভাব পড়বেই। ইরানের জগদ্বিখ্যাত মরমী কবি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি এ সম্পর্কে লিখেছেনঃ
অসৎ বন্ধু থেকে দূরে থাকো যতোটা পারো!
সে যে বিষধর সাপের চেয়েও ভয়ংকর আরো
দুষ্ট সাপ শুধু আঘাত করে তোমার প্রাণের পর
অসৎ বন্ধু ছোবল মারে প্রাণের সাথে ঈমানের পর।
ফলে অধমের সাথে উত্তমের নিশ্চিন্তে চলার বিষয়টা যুক্তিযুক্ত নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে ভালো বন্ধুর বৈশিষ্ট্যের আরো একটি দিক হচ্ছে বন্ধুত্বের বন্ধন রক্ষা করা। ইমাম সাদেক (আ) বন্ধুত্বের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যেমন বন্ধু বানাবে তাকে যে প্রথমতঃ ভেতরে- বাইরে তোমার জন্যে একইরকম। অর্থাৎ বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে সততা রক্ষা করে। দ্বিতীয়তঃ তোমার ভালোকে নিজের ভালো, তোমার মন্দকে নিজের মন্দ বলে মনে করে। তৃতীয়তঃ যদি সম্পদশালী হয়ে যায় বা উচ্চ পদে আসীন হয়,তাহলে আচরণ পাল্টায় না। চতুর্থতঃ তোমাকে বিপদের মাঝে ছেড়ে চলে যায় না বা একাকী ফেলে যায় না ইত্যাদি।
বন্ধুত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো সততা রক্ষা করা। ইমাম হাসানে মুজতবা (আ) এর একজন ভক্ত একদিন ইমামের কাছে এসে তাঁর বন্ধু ও সহচর হতে চাইলো। ইমাম ঐ লোকের চেহারার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন এবং ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বললেনঃ "আমি তোমাকে আমার বন্ধুর মর্যাদায় অভিষিক্ত করবো তবে কয়েকটি শর্ত আছে যেগুলো আমার সাথে বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে অবশ্যই রক্ষা করে চলতে হবে।" লোকটি ইমামের শর্ত মানার প্রতিশ্রুতি দিলো। ইমাম তখন বললেনঃ "আমার বন্ধু হতে চাইলে আমার গুণকীর্তন গাইতে পারবে না, কারণ আমি নিজের ব্যাপারে ভালোভাবেই সচেতন, কখনো আমাকে মিথ্যা বলবে না কেননা মিথ্যার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই; একইভাবে আমার কাছে কারো ব্যাপারে গীবত করতে পারবে না।" লোকটি এবার চুপ মেরে গেল,যেহেতু তার মাঝে এ সব গুণ ছিল না তাই সে ইমামকে বললোঃ 'হে রাসূলে খোদার সন্তান! আমাকে ফিরে যাবার অনুমতি দিন।' ইমামের মুখে হাসির রেখা লেগেই ছিল, সেই সহাস্য মুখেই তিনি বললেনঃ 'তোমার যেমন ইচ্ছে, সমস্যা নেই।'
বন্ধুকে সম্মান করা বন্ধুত্বের নীতিমালার আরেকটি বৈশিষ্ট্য। কারণটা হলো বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে যে বন্ধন তৈরি হয়, তারফলে একজনের প্রতি আরেকজনের একটা অধিকার সৃষ্টি হয়, আর সেই অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অবশ্য কর্তব্য। সর্বোপরি একজন মুসলমান হিসেবে দায়িত্ব হলো অপরের সম্মান রক্ষা করা। চাই তা নীতিকৌশল পরিবর্তনের ব্যাপারেই হোক কিংবা ব্যক্তির আচার আচরণে সংস্কার আনার ব্যাপারেই হোক, অবশ্যই সাহায্য করতে হবে। ইমাম আলী (আ.) একদিন কুফায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে এক ইহুদির সাথে দেখা। ঐ ইহুদি লোকটিও কুফার দিকেই যাচ্ছিল। ইহুদি লোকটি হযরত আলী (আ.)কে চিনতো না এবং জানতোও না যে তিনিই মুসলমানদের খলিফা। কিন্তু একই গন্তব্যের যাত্রী যেহেতু সেজন্যে আলী (আ.) সাথেই যাচ্ছিলো। যেতে যেতে এক সময় দুজনের মাঝে কিছু কথাবার্তা হলো। কথা বলতে বলতে একটি তেমোহনীতে এসে পৌঁছলো। সেখান থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে কুফার দিকে অপরটি তার আশপাশের কোনো এলাকার দিকে।
ইমাম আলী (আ.) ঐ তেমোহনীতে এসে কুফার পথে পাড়ি না জমিয়ে অপর পথে অগ্রসর হয়ে ইহুদি লোকটিকে সঙ্গ দিলেন। ইহুদি লোকটি জানতো যে তার সঙ্গী অর্থাৎ আলী (আ.) কুফায় যাবে, এখন ভিন্নপথে যাচ্ছে দেখে জিজ্ঞেস করলোঃ 'তুমি না বলছিলে কুফায় যাবে?' ইমাম বললেনঃ হ্যাঁ,বলেছি। ইহুদি লোকটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ 'তুমি তো কুফার পথ চেনোই, তাহলে আমার সাথে আসছো কেন'? ইমাম জবাবে বললেনঃ 'আমরা চলার পথে বন্ধু হয়েছি, বন্ধুত্বপূর্ণ সফরের শুভ পরিসমাপ্তির জন্যেই তোমার সাথে যাচ্ছি,কেননা আমাদের নবী রাসূলে খোদা (সা.) বলেছেন পথিক বন্ধুর প্রতি সম্মান দেখানোর স্বার্থে বিচ্ছিন্ন হবার সময় কিছুটা পথ বন্ধুকে সঙ্গ দেওয়া উচিত অর্থাৎ তাকে কিছুটা এগিয়ে দেওয়া উচিত।' ইহুদি লোকটি জিজ্ঞেস করলোঃ সত্যিই তোমাদের নবী এরকম বলেছেন?' ইমাম বললেনঃ হ্যাঁ।
ইহুদি লোকটি ইমাম আলী (আ.) এর চিত্ত্বাকর্ষক এই আচরণ আর নৈতিকতায় মুগ্ধ হয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত মুসলমান হয়ে যান।
বন্ধুত্বের নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার হচ্ছে অসুখ-বিসুখ, বিপদ-আপদেও বন্ধুত্ব অটুট রাখা। যেমনটি কবি সাদি বলেছেনঃ 'বন্ধু হলো সে-ই, যে বন্ধুর হাত ধরে মানসিক অস্থিরতা আর চরম দুরবস্থায়'। লোকমান হাকিম বলেছেনঃ 'প্রয়োজনের মুহূর্ত ছাড়া বন্ধুকে চেনা যায় না।' কেউ যখন অসুস্থতায় ভোগে তখন তার প্রতি সেবাযত্নের প্রয়োজন হয়, সে সময় অসুস্থ ব্যক্তি আশা করে বন্ধুরা তার সেবায় এগিয়ে আসবে। নবীজীর আহলে বাইতের মহান ইমাম হযরত আলী (আ.) যখন শুনতে পেলেন তাঁর বন্ধু হারেস হামেদানী অসুস্থ এবং একেবার মরণাপন্ন অবস্থা, তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর সেবায় যাবেন এবং যথারীতি চলে যান। ঘরে ঢুকে হারেসের শিয়রে বসলেন। হারেস তার চোখ মেলে আমিরুল মোমেনিন (আ.) কে দেখতে পেল তার পাশে। ইমাম তার খোঁজখবর নিলেন এবং তার মনস্তুষ্টির জন্যে তিনবার বললেনঃ 'হে হারেস! পরকালেও এই দুনিয়ার বন্ধুকে বন্ধু হিসেবে পাবে এবং তার সাহচর্য ধন্য হবে'। হারেস যেহেতু ইমামকে ভীষণ ভালবাসতো, ইমামের একথায় ভীষণ খুশি হয়ে গেল এবং কিছুক্ষণের জন্যে একটু ভালো অনুভব করে উঠে বসে বললো। 'এখন আর কোনো ভয় কিংবা শঙ্কা নেই যে আমি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবো নাকি মৃত্যু আমার দিকে এগিয়ে আসবে।' এর কিছুক্ষণ পরই হারেস মৃত্যুবরণ করেন।
বন্ধুত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার হলো ব্যক্তিগত অহমিকা বা গর্ব পরিহার করা। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যখন গভীর হয় তখন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কাছ থেকে কেবল যে সম্মানই পায় তা-ই নয় বরং নিজেকে কেউ বড়ো করে দেখারও চেষ্টা করে না, অহংকারও করে বেড়ায় না। পবিত্র কোরআনের সূরা যুমারের ষাট নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃ 'অহংকারীদের স্থান হচ্ছে দোযখ।' সূরা শুয়ারার ২১৫ নম্বর আয়াতেও বলা হয়েছেঃ 'আপনাকে যারা অনুসরণ করছে সেইসব মুমিনের জন্যে আপনার পাখা বিস্তৃত করুন অর্থাৎ তাদের প্রতি সদয় হোন।' ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুদের সাথে আচরণ হতে হবে সদয়, আন্তরিক এবং বিনয়ী। তবে গঠনমূলক সমালোচনাও বন্ধুত্বের মাঝে বিদ্যমান অনিবার্য একটি শিষ্টাচার। হাদিসে এসেছে, রাসূলে খোদা (সা) বলেছেনঃ 'এক মুমিন আরেক মুমিনের জন্যে আয়নার মতো।' তাই বন্ধুর দোষত্রুটিগুলো শোধরানোর ব্যাপারে সহযোগিতা করা শিষ্টাচারভুক্ত। কেননা এতে মঙ্গল ও কল্যাণ নিহিত রয়েছে। গঠনমূলকভাবে বন্ধুরর দোষগুলো ধরে দিলে বন্ধু রাগ তো করবেই না বরং ভাববে সেই তো পরম শুভাকাঙ্ক্ষী। তাই তাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব আরো দৃঢ় আরো গভীর হবে। তবে কখনো ভুল করলে ক্ষমা চাওয়াটাও একটা শিষ্টাচার। কেননা ভুল স্বীকারের মধ্যেই রয়েছে সংশোধনের বীজ। ইমাম আলী (আ) এর ভাষ্য অনুযায়ী 'সবচেয়ে মন্দ লোক হলো সে-ই যে ভুল স্বীকার করতে রাজি নয়।' 



(collected )

বন্ধু দিবসের সাতকাহন

বিশ্ব বন্ধু দিবস। সবাই হয়তো জানেন, আগস্ট মাসের ১ম রবিবারটাই পালিত হয় বন্ধু দিবস হিসেবে। আচ্ছা, এই দিবসের সংঙ্গাটা একটু অদ্ভুত না? ১লা জানুয়ারী, ২১শে ফেব্রুয়ারীর মতো নির্দিষ্ট কোন তারিখ না, বরং আগস্ট মাসের ১ম রবিবার। রবিবার । কেন? কেন মঙ্গল কিংবা বৃহস্পতি বার না? কখনো এই প্রশ্ন আসেনি মনে? আপনার এসেছে কিনা জানিনা, তবে আমার এসেছে। তাইতো গুগলে মেতেছিলাম অনেকটা সময়। শেষ পর্যন্ত যা পেলাম তার সারমর্ম এই-

১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস বন্ধুত্বের গুরুত্ব অনুধাবন করে একটা দিনকে ‘জাতীয় বন্ধু দিবস’ [১]। এর পিছনে কারণ কী ছিল, তা নিশ্চিত না হলেও ধারণা করা হয় - ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর জনমনে যে অবিশ্বাস আর শত্রুতা জন্ম নিয়েছিল তার প্রেক্ষিতেই বন্ধু দিবসের শুরু। লক্ষ্য করুন - ‘জাতীয়’ বন্ধু দিবস, ‘আন্তর্জাতিক’ নয়। তাহলে এটা আন্তর্জাতিক হল কবে? জাতিসংঘের মতো কোন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও এ ঘোষণা এসেছে বলে কোন তথ্য পাইনি। আসলে যা হয়েছে - যুক্তরাষ্ট্রে এ দিবসের সাফল্য দেখে অন্যান্য দেশও তা পালন করতে থাকে। কালে তা আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। তবে এই আন্তর্জাতিক রূপ সার্বজনীন নয়। কিছু দেশ আছে যারা একই দিনে বন্ধু দিবস পালন করেনা। যেমন, দক্ষিন আমেরিকার কিছু দেশে যেখানে ২০শে জুলাই বন্ধু দিবস, সেখানে প্যারাগুয়েতে তা ৩০শে জুলাই [২]। আবার চিলিতে নিয়মটা হল - অক্টোবরের প্রথম শুক্রবার। এদিকে সিঙ্গাপুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধু দিবস পালন করা হয় ২য় টার্মের ৩য় কার্যক্ষম শুক্রবার (3rd working Friday)[৩]।

অ! যে কারণে গুগলের আশ্রয় নিয়েছিলাম - তাইতো বলা হল না। কেন রবিবার? আসলে এরও কোন সনির্দিষ্ট কারণ পাইনি। অগত্যা সাধারণ বুদ্ধি-বিবেচনার আশ্রয় নিতে হল। আমার যা মনে হয় - যুক্তরাষ্ট্রে সাপ্তাহিক ছুটি রবিবার। আর বন্ধু দিবস হিসেবে এমন একটা দিনকে বেছে নেয়া হয়েছে যেদিন সকলে কাজকর্মের চিন্তা দূরে রেখে সবার সাথে নিশ্চিন্তে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারে। আর আমার ভিতরে গন্ডগোলটাও এখানেই। যুক্তরাষ্ট্রের লোক যদি তাদের সুবিধামতো (এবং অবশ্যই যুক্তিসংগত) দিনে বন্ধু দিবস পালন করতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারিনা? আর এটা তো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোন সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিতও না। তাহলে আমরা কেন আগষ্টের ১ম শুক্রবারকে বন্ধু দিবস বলিনা? আমার ছোট্ট মাথায় এর উত্তর আসে না।


 ( সংগৃহীত )

মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১১

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি, হুমায়ুন আহমেদ

হুমায়ুন আহমেদ এর সাথে আমার প্রথম দেখা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে- উনার খাস কামরায়।

আমি নিজেও তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কিন্ত অবস্থান করতাম তার থেকে যোজন যোজন দুরের ডিপার্টমেন্টে। লিটল ম্যাগাজিন এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তো কোন একটা সংখ্যায় ১৪ ফেব্রুয়ারীর ছাত্র আন্দোলন নিয়ে তার মন্তব্য জানার জন্য তার কাছে গিয়েছিলাম। সালাম দিয়ে আমার উদ্দেশ্যের কথা বলতেই উনি বললেন- আসলে কি জানো পুরো ব্যাপারটাই (ফেব্রুয়ারীর ছাত্র আন্দোলন) আমার অন্যের মুখে শোনা, কিছুটা পত্রিকার পাতায় দেখা। আমি তো তখন দেশের বাইরে........

উনি এরপর জরুরী কাজে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, আমাকে বললেন- চলো, গাড়ীতে যেতে যেতে বাকী আলাপ করে ফেলা যাবে। সে সময় টেলিভিশনে উনার একটা ধারাবাহিক চলছিল-নাম ভুলে গেছি, ওই যেটার মধ্যে আফজল অভিনয় করেছিল ডাক্তার চরিত্রে, আর খুব বোকা বোকা সব কান্ড করতো।

গাড়ীতে উঠে আমি বললাম- আপনার ওপর ডাক্তাররা তো ভীষন ক্ষেপে আছে, আপনি নাকি ডাক্তারদের ভাবমুর্তি ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন? উনি হাসলেন-আরে শুধু ডাক্তারদের কথা বলো কেন, সৈয়দ বংশের লোকেরাও মহা ক্ষিপ্ত, আচ্ছা বলো তো- সবাই সিরিয়াসলি সব কিছু নেয় কেন, নাটক তো নাটকই। আমাকে অনেকে বলেছে- এই যে আমার নাটকে আমি কাজের লোকদের দেখাচ্ছি তারা ডাইনিং টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছে, তো এটা আমি ব্যক্তিগত জীবনে অনুশীলন করবো কিনা। যদি তা না করি তবে কেন এসব ভন্ডামী করছি। এখন এর উত্তরে আমি কি বলতে পারি, এটা তো বুদ্ধিমানের মতো কথা হলো না। আমি আর আমার নাটকের চরিত্র তো এক জিনিষ না, ডেফিনিটলি আমি আমার বাসায় কাজের লোকদের ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়া এলাও করবো না, কারন আমি তো অমুক (উনার নাটকের সেই চরিত্রের নাম বললেন, যেটায় আবুল হায়াত অভিনয় করেছিলেন) নই। জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি তো আমার নয়। ফলে আমাকে কেন তার মতো আচরন করতে হবে?
আমি গম্ভীর ভাবে বললাম- আসলে বাঙালীর সেন্স অব হিউমার কমে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, এর পর বিপদ এড়াতে আপনার পরবর্তী নাটকের চরিত্র গুলো ভীনগ্রহের- এ্যটলিষ্ট বাংলাদেশের বাইরে থাকে আনা উচিত.......

আমার কথায় উনি হাসলেন।


( collected )

সোমবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০১১

রবি ঠাকুরের জমিদারি বনাম কবি নজরুলের জঠর জ্বালা

রবি ঠাকুরের জমিদারি বনাম কবি নজরুলের জঠর জ্বালা

দুঃখ যেন তার পিছু ছাড়ছে না। চরম দুঃখ-যাতনা ছিল কাজী নজরুলের জীবন সাথী। ১৯০৭ সালে বয়স যখন আট তখন তিনি পিতা হারান। সে সময়ে দারিদ্রতা আর সৎ ভাইয়ের অবহেলায় তিনি বাউণ্ডেলে জীবন যাপন শুরু করেন। লেটোর দলে, চায়ের দোকানে কাজ করেন। নজরুল যখন দুঃখ-কষ্টের অথৈ দরিয়ায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখন তার মা জাহেদা খাতুন বিয়ে করেন তার চাচাকে। কাটা ঘায়ে নূনের ছিটার মতো মনে হলো নজরুলের কাছে। মা বিয়ে করেছিলেন নজরুলের বোন কুলসুমকে বিয়ে দেয়ার নাম করে। কিন্তু তিনি এ বিয়ে মেনে নিতে পারেন নি। লজ্জায় ক্ষোভে নজরুল কোনো দিন তার মায়ের সামনে যান নি। এমনকি ১৯২৩ সালে হুগলির জেলে তার মা দেখা করতে গেলেও তিনি দেখা করেন নি। জাগরণের কবি, পরিবর্তনের কবি, সাম্যের কবি, ইনসাফের কবি, মৈত্রীর কবি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কবি, সত্য প্রকাশের অকুতোভয় কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের প্রতি কি আমরা কম অবহেলা করছি? আমরা তো তার সৎ ভাইয়ের মতোই তার প্রতি আচরণ করছি। তাকে যদি আমরা এত অবহেলাই করবো তবে তাকে জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিলাম কেন? আমরা আমাদের জাতীয় কবিকে আড়ালে রেখে ভিন দেশের বিশ্ব কবিকে নিয়ে যেভাবে মাতামাতি শুরু করছি তাতে মনে হয় আমরা মাসির ভূমিকায় নেমেছি। অথচ ভারতে রবি ঠাকুরকে নিয়ে এতো মাতামাতি নেই। যে সময়ে রবি ঠাকুর জমিদারি শুরু করেন সে সময়ে নজরুল জঠর জ্বালায় কাতর। এক টুকরো রুটির জন্য চায়ের দোকানে শ্রম বিক্রি করেন। যে বছর রবি ঠাকুর সাহেত্যে নোবেল প্রাইজ পান সে বছর নজরুল দু'কলম বিদ্যা অর্জনের জন্য লজিং বাড়ীতে উঠেন। যে সময়ে রবি ঠাকুর ইংরেজদের অতি প্রিয় 'কবি' সে সময়ে নজরুল ইংরেজদের অতি ভয়ংকর শত্রু। নজরুল চাইলে ইংরেজদের পদলেহন করে দু'পয়সা কামাই করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা না করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কবিতা লেখেন, ঘুমন্ত ভারতবাসীকে জাগিয়ে তুলেন। আর আমাদের বিশ্ব কবি দখলদার ইংরেজদের গুণগান গেয়ে কবিতা লেখেন। অসামপ্রদায়িক নজরুল ছিলেন মানব দরদী এক মহান কবি। নজরুল ছিলেন বঞ্চিতদের বলিষ্ট কষ্টস্বর। ধর্ম-বর্ণের উর্দ্ধে ছিলেন তিনি। তিনি হিন্দু-মুসলিম সকলের কল্যাণে কাজ করেছেন। অপরপক্ষে মুসলিমরা শিক্ষিত হউক তা আমাদের বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ চাইতেন না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন। ভাগ্যের কী নিমর্ম পরিহাস আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রবি বন্দনার জোয়ার বইছে। আমরা আজ নজরুলকে আঁধারে রেখে রবির পূজায় মশগুল। রবির আদর্শের কাঙ্গাল! দুখু মিয়ার দুখের যেন শেষ নেই। রবীন্দ্রনাথের আদর্শ গ্রহণের জন্য আমরা আজ প্রতিযোগিতায় নেমেছি। কার চেয়ে কে বেশী রবীন্দ্র ভক্ত তা প্রমাণের জন্য একেকজন গলদ্ঘর্ম। রবি ঠাকুরের আদর্শ হচ্ছে ভোগের আর নজরুলের আদর্শ ত্যাগের। রবীন্দ্রনাথের আদর্শ হচ্ছে অত্যাচারী রাজ শক্তিকে প্রণাম করা আর নজরুলের আদর্শ হচ্ছে অত্যাচারী রাজ শক্তির বিরোদ্ধে বিদ্রোহ করা, প্রতিবাদ করা, প্রতিরোধ করা। আজ সারা বিশ্বে অত্যাচারী রাজ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই সময়ের দাবী হচ্ছে নজরুলের আদর্শে উজ্জিবিত হয়ে আগ্রাসী শক্তির মোকাবেলা করা । রবীন্দ্রনাথের আদর্শ গ্রহণ করে বিশ্ব মোড়লদেরকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য শোভনীয় নয়। আজ ১১২তম জন্ম দিনে নজরুলের প্রতি রইল আমাদের দোয়া। তাকে আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করুন। কলকাতার সুবিধা ভোগী কিছু বুদ্ধিজীবী যারা রবির দরদে আজ প্রায় উম্মাদ তারাও জানেন নজরুল নিমোর্হের কবি, সত্যিকারের সাম্যের কবি আর রবি ঠাকুর সামপ্রদায়িক কবি, অত্যাচারী রাজ শক্তির অনুকুলের কবি। তার পরও তারা জেনে শুনে ভন্ডামী করছেন। এই ভন্ডদের প্রতি নজরুলের ভাষায়- দোহাই তোদের। এবার তোরা সত্যি করে সত্য বল। ঢের দেখালি ঢাক ঢাক গুড় গুড় ঢের মিথ্যা ছল। পেটে এক আর মুখে আরেক এই যে তোদের ভন্ডামী। এতেই তোরা লোক হাসালি বিশ্বে হলি কম দামী।


(  সংগৃহীত )

শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১১

পেশাজীবী বা বৃত্তিজীবীদের ক্ষেত্রে সফলতার দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত?

পেশাজীবী বা বৃত্তিজীবীদের ক্ষেত্রে সফলতার দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত?

Question: 
পেশাজীবী বা বৃত্তিজীবীদের ক্ষেত্রে সফলতার দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত?
Answer: 
পেশাজীবী অর্থাৎ একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লইয়ার, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট বা কনসালটেন্ট হিসেবে যখন একজন স্বাধীন পেশায় নিয়োজিত থাকেন তখন সেখানে সাফল্য অর্জনের জন্যে চারটি বিষয় প্রয়োজন। প্রথমত, উদ্যম- নতুন কিছু, বড় কিছু করার। দ্বিতীয়ত, পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা। তৃতীয়ত, পেশার প্রতি ভালবাসা, আন্তরিকতা এবং দায়িত্ব পালনে বিশ্বস্ততা। চতুর্থত, জনসংযোগ বা পরিচিতি। এই চারটি বিষয় যদি একজন পেশাজীবী আয়ত্ত করেন তিনি শুধু বৈষয়িকভাবে সফল হবেন তা নয়, একজন সৃজনশীল কীর্তিমান পেশাজীবী হিসেবেও স্মরণীয় হবেন। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, আমাদের সমাজের অধিকাংশ পেশাজীবী বিপুল অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে সাফল্যের এ শর্তগুলো অবহেলা করেন। ফলে একসময় পেশাজীবীদের যে মর্যাদার চোখে দেখা হতো এখন তা অনেকটাই দুর্লভ।
যেমন, ৭০ এর দশক পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক ছিলেন যাদের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয়। কিন্তু এরপর থেকে পট বদল হতে লাগলো। জ্ঞানচর্চায় ব্রতী ছাত্র অন্তঃপ্রাণ শিক্ষকের জায়গায় এসে দাঁড়ালো অর্থোপার্জনের নেশায় পাগল দিনমান প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটতে ব্যস্ত শিক্ষক নামের কিছু আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি থেকে শুরু করে ছাত্রদের ব্যবহার করতেও তাদের দ্বিধা হয় না। যদিও এখনও অনেক শিক্ষক আছেন যারা সত্যিকার অর্থেই শ্রদ্ধেয় তাদের গভীর জ্ঞান, পান্ডিত্য, ব্যক্তিত্ব এবং আদর্শের জন্যে। কিন্তু এখনকার সাধারণ প্রবণতা হলো রাজনীতির লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত শিক্ষক সুযোগ পেলেই ক্লাস বর্জন, ধর্মঘট, রাস্তায় আন্দোলন ইত্যাদির ঘোষণা দেন। এতে তার ছাত্র-ছাত্রীরা জ্ঞানার্জনে পিছিয়ে পড়ুক কিংবা সেশন জ্যামে আটকে পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ুক- তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। মজার ব্যাপার হলো, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস না নিয়ে মহা উৎসাহে ধর্মঘট পালন করলেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক সময়েই তিনি হাজিরা দেন। কারণ মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে সেখানে তিনি বা তার ছাত্ররা এ জাতীয় আন্দোলনের কথা দূরতম কল্পনাতেও ভাবতে পারেন না।
আসলে একজন পেশাজীবী শিক্ষক হতে পারেন বা ডাক্তার হতে পারেন। কিন্তু নীতিগতভাবে তিনি কখনো বলতে পারেন না যে, আমি পড়াবো না বা আমি রোগী দেখবো না- যতক্ষণ তিনি একজন শিক্ষক বা ডাক্তার হিসেবে নিয়োজিত আছেন। যেকোনো সময় সেবা দেয়ার জন্যে আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। একজন মানুষ যেকোনো সময় এলে যাতে আপনার সেবা পেতে পারে। ধরুন, আপনি একজন দর্জি। এটাও একটা স্বাধীন পেশা। আপনি কাপড় তৈরি করেন, আপনাকে প্রত্যেকের মাপমতোই কাপড় তৈরি করতে হবে। মি. এক্স এর মাপে মি. ওয়াই এর কাপড় বানালে কী হবে? বা আপনি তাকে যে সময় বললেন যে কাপড় তৈরি করে দেয়া হবে তার অন্তত একদিন আগে কাপড়টি তৈরি করে রাখতে হবে। যাতে সে আসার সাথে সাথে তাকে দিতে পারেন। দুইদিন আগে করে রাখতে পারলে আরো ভালো।
আর একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের এটা কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয়, আজকে তার এই অবস্থান তৈরির জন্যে কত নিরন্ন মানুষের ট্যাক্সের টাকায় তিনি প্রায় বিনা পয়সায় বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। শুধু তা-ই নয়, এখন তার যে বেতন সেটার অর্থায়নও হয় এই ট্যাক্সের টাকায়। নিজের বিবেকের কাছেই তার জিজ্ঞেস করা উচিত এই ঋণ বা দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তির কতটা চেষ্টা তিনি করেছেন। ক্লাস বর্জনে বা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তার ঋণের বোঝা কি দিনে দিনে আরো বাড়ছে না? হ্যাঁ, তিনি অবশ্যই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে যতক্ষণ একটি জায়গায় সেবাদানের চুক্তিতে তিনি আবদ্ধ ততক্ষণ ঐ দায়িত্বই পালন করতে হবে চূড়ান্ত নিষ্ঠার সাথে। যখন যা খুশি করার কোনো অধিকার আর তখন থাকে না বা নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে যাওয়ার দ্বৈত নীতি অনুসরণ করার সুযোগও আর থাকে না। তা করলে তিনি তার শপথেরই লঙ্ঘন করলেন। আর তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি শ্রদ্ধা হারাবেন। কারণ শুধু পদ-পদবি বা কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানে থাকলেই শ্রদ্ধা পাওয়া যায় না। শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্যে ব্যক্তিকেই কাজ করতে হবে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে।
আর বৃত্তির ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বস্ততা বলতে বোঝায়- ধরুন, আপনি পরার্মশ দিচ্ছেন একজনকে। পরামর্শদাতা হিসেবে আপনাকে বিশ্বস্ত হতে হবে। যদি আপনি বিশ্বস্ত না হন, যারা পরামর্শ নিতে আসছেন তারা যদি মনে করেন যে সে যা বলছে তা আপনি কাউকে বলে দিতে পারেন। তাহলে আপনি পরামর্শদাতা হিসেবে ব্যর্থ হবেন। কেউ আপনার কাছে পরামর্শের জন্যে আসবে না। তাই আপনাকে আপনার পেশার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হবে।

পরীক্ষার্থীর মানসিক চাপ কমাতে মা-বাবার ভূমিকা




পরীক্ষার্থীর মানসিক চাপ কমাতে মা-বাবার ভূমিকা

ডা. মুনতাসীর মারুফ



এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা মানসিক চাপ অনুভব করে। কেননা, শিক্ষার্থীর মাঝে পাবলিক পরীক্ষা সম্পর্কে সমাজ বা পরিবারের বিভিন্ন স্তর থেকে জানতে বা অজান্তে অহেতুক ভয় ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এর আগে বহুবার পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেও স্কুলে টেস্ট বা প্রি-টেস্টে এসএসসি পরীক্ষার চেয়েও কঠিন প্রশ্নপত্র পার করে এলেও জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অনেকের কাছে মৃত্যুদণ্ডের আদেশের সমতুল্য ভীতিকর হয়েই দেখা দেয়।
এই মানসিক চাপ আরো বাড়িয়ে দিতে পারে পরীক্ষা নিয়ে বাবা-মার অযৌক্তিক প্রত্যাশা ও ব্যবহার। অনেকের প্রত্যাশা, সেই ভালো ফলাফলটা হবে তাদের বাবা-মায়ের চাহিদামাফিক। অর্থাৎ কিনা তারা যে ফলাফলকে ভালো মনে করবেন, সন্তানকে সেই ফলাফলই নিয়ে আসতে হবে। অনেক সময় বাস্তবতা বা শিক্ষার্থীর প্রকৃত ক্ষমতা-যোগ্যতা অনুধাবন না করেই তারা প্রত্যাশার এ বোঝা চাপিয়ে দেন। অনেক বাবা-মা তাদের জীবনের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। এর অন্যথা হলে তারা হতাশায় ভোগেন। সন্তানের পরীক্ষার ফলাফল বাবা-মা নিজেদের সামাজিক অবস্থানের নিয়ামক হিসেবে ভাবেন। সন্তান পরীক্ষায় খারাপ করলে সমাজ তাদের ‘ব্যর্থ বাবা-মা’ হিসেবে চিহ্নিত করবে এ উদ্বেগও পেয়ে বসে অনেককে। সবার যোগ্যতা ও ক্ষমতা যে এক রকম নয়-এ সত্যটি যেন তারা বুঝতে চান না। তাদের দৃষ্টিতে সন্তানের প্রত্যাশিত ফলাফলের সামান্য বিচ্যুতিও ক্ষমার অযোগ্য। পাশের বাড়ির ছেলেটির চেয়ে বা ক্লাসে একই বেঞ্চে বসা সহপাঠীর চেয়ে দুই-এক নম্বর পেছনে থাকাও তারা সহজভাবে মেনে নিতে পারেন না। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ‘খারাপ’ ফলাফলের জন্য সন্তানকে বকাবকি, নেতিবাচক সমালোচনা, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে সব সময় পড়াশোনা ও ফলাফল নিয়ে কটাক্ষ করতে, এমনকি শারীরিকভাবে প্রহার করতেও দেখা যায় অনেককে। বাবা-মায়ের ধারণা তারা সেটা করেন সন্তানের ভালোর জন্যই। কিন্তু ফল হতে পারে উল্টো। পরীক্ষার ফলাফলের প্রেক্ষিতে বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর ভেতর ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করে। পরীক্ষার পড়া নিয়ে না ভেবে ফলাফলে বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়াই হয়ে ওঠে মূল ভাবনা, যা পড়াশোনায় সহায়তা না করে  উল্টো নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
পরীক্ষার্থীর পরীক্ষাজনিত উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা দূর করতে বাবা-মা হতে পারেন সবচেয়ে বড় বন্ধু। এ জন্য সবার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিয়ে বাবা-মায়ের অযৌক্তিক ও ভুল চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন। সন্তানের যোগ্যতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা নিন, সেই মতো প্রত্যাশা করুন, ভালো করতে তাকে সহযোগিতা করুন, কিন্তু অতি প্রত্যাশার বোঝা ঘাড়ে চাপিয়ে নয়। বারবার সন্তানের নেতিবাচক সমালোচনা ও অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না। ‘তোমাকে দিয়ে তো কিছুই হবে না,’ ‘তুমি পারবে না’-বাবা-মায়ের মুখ থেকে এ ধরনের কথা শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। ইতিবাচক থাকুন। সন্তানকেও ইতিবাচকভাবে ভাবতে শেখান। পরীক্ষার দিনগুলোতে সন্তানকে বাড়তি সময় দিন, তার উদ্বেগের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, দুর্বলতা-ভীতি কাটিয়ে নিজের ওপর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাকে উৎসাহ দিন, সহায়তা করুন। তবে বাড়তি সময় দেয়া মানে পড়ার সময় সর্বক্ষণ সামনে বসে থাকা নয়। এটাও আবার অনেক শিক্ষার্থীর জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সন্তানের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করুন। কিন্তু এ ব্যাপারে অতিরিক্ত মনোযোগ দেখাতে গিয়ে অতিভোজনে বাধ্য করে তার শরীরকে অলস ও নিদ্রাকাতর করে তুলবেন না। এ সময় বেশি খেলেই মেধা বাড়বে-এ ধারণা ঠিক নয়। পরীক্ষার্থীকে একটানা পড়তে বাধ্য করবেন না। পড়ার মাঝে বিরতি নিতে দিন। সুস্থ বিনোদন ও শরীরচর্চায় নিয়মিত কিছুটা সময় ব্যয় করতে দিন। পরীক্ষার আগের রাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে নিতে সহায়তা করুন। অধিক রাত জাগতে নিরুৎসাহিত করুন। এক বিষয়ের পরীক্ষার পর সেই বিষয়ে কী কী ভুল করল, সেবব খুঁটিয়ে বের না করে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিতে সাহায্য করুন। মনে রাখবেন, পরীক্ষা স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে একটা চাপের বিষয়। বাবা বা মা হিসেবে আপনি এর সঙ্গে বাড়তি চাপ যোগ করে পরিস্থিতি সন্তানের জন্য অসহনীয় করে তুলবেন না বরং মানসিক চাপমুক্তভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে সন্তানকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করুন। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।